সাংবাদিকদের আবাসন নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বরাদ্দ দেওয়া ৪০ দশমিক ৬২ কাঠা জমি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।
রোববার (১৮ অক্টোবর) চট্টগ্রামের পঞ্চম সিনিয়র সিভিল জজ আদালত এ আদেশ দেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের (চমেসাস) নামে বরাদ্দ দেওয়া এ জমি বিক্রির উদ্যোগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর এ আদেশ দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে জমি হস্তান্তর না করতে বিবাদীদের ১৫ দিনের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আদালত সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখারও নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী খায়েরুন্নেছা আকতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘৮৪/২০২৬ নম্বর মামলায় রোববার নথি উপস্থাপন করে জমি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞার আবেদন জানানো হয়। আদালত আবেদনটি বিবেচনায় নিয়ে তফসিলে বর্ণিত সম্পত্তি হস্তান্তর না করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বিবাদীদের ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।’
চমেসাসের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, সদস্যদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের শর্তে বরাদ্দ পাওয়া জমিতে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে তা বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন জেলা সমবায় কর্মকর্তা সিফাত উল্লাহ তাসনিম।
অভিযোগ রয়েছে, জমির বায়নানামায় মূল্য দেখানো হয়েছে ২৫ কোটি টাকা, যদিও প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৪৫ কোটি টাকা বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, মাত্র ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে খোলা একটি ব্যাংক হিসাবে এক বছরের কম সময়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য সামনে এসেছে। জমি বিক্রির অগ্রিম অর্থও ওই হিসাবে লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় জমি বিক্রির প্রক্রিয়া, বায়নানামার আর্থিক হিসাব ও সমিতির সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জমি বিক্রি ও হস্তান্তর বন্ধ রাখতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান এবং চান্দগাঁও সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা নিয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
ফ্ল্যাট নির্মাণের শর্তে বরাদ্দ জমি :
সমবায় অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম নগরের কল্পলোক আবাসিক এলাকায় চমেসাসকে ৪০ দশমিক ৬২ কাঠা জমি বরাদ্দ দেয় চউক। ওই বছরের ২২ অক্টোবর দেওয়া বরাদ্দপত্রে জমির শ্রেণি উল্লেখ করা হয় ‘ব্লক অ্যাপার্টমেন্ট’। বরাদ্দের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমিতির সদস্যদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা।
বরাদ্দের শর্ত অনুযায়ী, জমিতে ভবন নির্মাণ করে সদস্যদের মধ্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ভবনের নকশা সিডিএর অনুমোদন নিতে হবে। নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় দলিল সম্পাদনের পর আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল। অর্থাৎ, সাংবাদিকদের আবাসন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই জমিটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। জমি খালি অবস্থায় বিক্রি করে অর্থ ভাগ করে নেওয়ার জন্য এ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সেখানে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে জমি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়ায় সমিতির সদস্যদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সদস্যদের অভিযোগ, জমি বিক্রি করা হলে যারা ফ্ল্যাট পাওয়ার আশায় ছিলেন, তারা আবাসনের সুযোগ হারাবেন। পাশাপাশি জমি বিক্রির অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হবে এবং সদস্যদের মধ্যে কীভাবে বণ্টন করা হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য তাঁদের জানানো হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই বায়নানামা :
জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় গত ২১ সেপ্টেম্বর চিঠিতে জমি বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, সমিতির সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। এ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের প্রশাসন শাখা-২’-এর পরিপত্র অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। জেলা সমবায় কর্মকর্তা ওই কমিটির একজন সদস্য।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট জমি বিক্রি বা হস্তান্তরের অনুমোদন চেয়ে জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ে কোনো আবেদন জমা দেওয়া হয়নি। এরপরও সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটি জমি বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ের মতে, এভাবে জমি বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হলে সমিতির সদস্যদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে। একই সঙ্গে সিডিএ যে উদ্দেশ্যে জমি বরাদ্দ দিয়েছিল, সেই উদ্দেশ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে পরবর্তী নির্দেশনা বা মতামত না পাওয়া পর্যন্ত জমি বিক্রি কিংবা হস্তান্তরের অনুমতি না দিতে চউকের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সমবায় সমিতি আইন, ২০০১’-এর ৪৮ (২) ধারার আওতায় সমিতির কার্যক্রম পরিদর্শনের জন্য রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা পার্থ কান্তি বিশ্বাসকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার প্রাথমিক পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য ও নথি পর্যালোচনার ভিত্তিতে জমি বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
২৫ কোটির বায়নানামা, প্রকৃত মূল্য ৪৫ কোটি টাকা? :
জানা গেছে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি জমি বিক্রির একটি বায়নানামা নিবন্ধন করা হয়। যার দলিল নম্বর- ৬৪৮/২০২৬। এতে জমির মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। তবে জমিটির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৪৫ কোটি টাকা বলে অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ, দলিলে উল্লেখ করা মূল্য ও অভিযোগে বলা প্রকৃত মূল্যের মধ্যে ব্যবধান ২০ কোটি টাকর বেশি। এই মূল্যবৈষম্যের অভিযোগের ভিত্তি কী, ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কত টাকায় লেনদেনের সমঝোতা হয়েছিল এবং বায়নানামার শর্ত অনুযায়ী কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে—এসব বিষয় এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বায়নানামায় অগ্রিম অর্থ পরিশোধের তথ্য রয়েছে। তবে ওই অর্থ সমিতির অনুমোদিত ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, জমি বিক্রির অগ্রিম অর্থ লেনদেনে এমন একটি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে, যার বিষয়ে সমিতির সদস্যদের পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয়নি।
অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের একটি বিবরণীতে দেখা গেছে, মাত্র ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে ইসলামী ব্যাংক আসকারদিঘী পাড় শাখায় হিসাবটি খোলা হয়েছিল। পরে এক বছরের কম সময়ে ওই হিসাবে প্রায় ১৩ কোটি টাকা লেনদেন হয়।
জমি বিক্রির অগ্রিম অর্থও এ হিসাবে লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
তবে ব্যাংক হিসাবটির পূর্ণাঙ্গ বিবরণী, অর্থ জমাদানকারী ও উত্তোলনকারীদের পরিচয়, লেনদেনের তারিখ এবং অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। শুধু বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য থেকে অর্থ আত্মসাৎ কিংবা অবৈধ ব্যবহারের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ব্যাংক নথি, বায়নানামা ও সমিতির হিসাবপত্র পরীক্ষা করা জরুরি।
সদস্যদের স্বার্থ নিয়ে উদ্বেগ :
সমিতির কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, আবাসন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ পাওয়া জমি বিক্রি করে অর্থ ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে সমিতির সব সদস্য সমানভাবে লাভবান হবেন কি না, তা নিয়ে তাঁদের সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে যারা ফ্ল্যাট পাওয়ার প্রত্যাশায় ছিলেন, জমি বিক্রি হলে তাদের আবাসনের সুযোগ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। সদস্যদের ভাষ্য, জমিটি বিক্রি হলে সমিতির দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ একবারের জন্য হাতছাড়া হয়ে যাবে। কিন্তু বিক্রির অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, সদস্যদের মধ্যে তা কীভাবে বণ্টন করা হবে এবং প্রত্যেকের স্বার্থ কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি।
এ কারণে জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার কার্যবিবরণী, সাধারণ সভার অনুমোদন, বায়নানামার শর্ত ও ব্যাংক হিসাবের লেনদেন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে জমি বিক্রির উদ্যোগে কারা জড়িত, অর্থ কোথায় গেছে এবং কোনো সদস্য ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
জমি হস্তান্তর ও নিবন্ধন বন্ধে চিঠি :
জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জমির তফসিল উল্লেখ করে বিক্রি বা হস্তান্তরের অনুমতি না দিতে সিডিএ চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একই বিষয়ে ২০ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়েও চিঠি দেন সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন কর্মকর্তা।
জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য ও নথির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। অনুমোদনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত জমির হস্তান্তর ও নিবন্ধন বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে জমি বিক্রির বিষয়ে সমিতির একাধিক সদস্যের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। রোববার আদালত জমি হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বিবাদীদের ১৫ দিনের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সম্পত্তির ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে জমি বিক্রির উদ্যোগ আপাতত আইনি বাধার মুখে পড়েছে। আদালতের এ আদেশের ফলে জমিটি নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান এবং বরাদ্দের শর্ত ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
কেকে/এমএ