জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে ফ্রান্সজুড়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। শনিবারের (১৭ অক্টোবর) ব্যাপক বিক্ষোভের পর রাজধানী প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে রোববারও সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
রোববার (১৮ অক্টোবর) এলিসি প্রাসাদ থেকে দেওয়া এক জাতীয় ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেন, বিক্ষোভকারীদের ন্যায্য দাবির সঙ্গে ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডকে এক করে দেখা উচিত নয়। সহিংসতার কোনো যৌক্তিকতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। শুরুতে অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগ ছড়িয়ে পড়ে।
প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর ও লুটপাট
প্যারিস, মার্সেই, লিলসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের একপর্যায়ে মুখোশ ও কালো পোশাক পরা কিছু ব্যক্তি দোকানপাট ও সরকারি স্থাপনায় হামলা চালায়। কোথাও গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, কোথাও ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
রোববার প্যারিস ও লিয়ঁর কয়েকটি এলাকায় তুলনামূলক কম মাত্রায় হলেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্যারিসে কয়েক শ মানুষের জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল ও পাথর ছোড়ার ঘটনাও ঘটে।
শনিবারের সহিংসতায় ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের জনজীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। লিমোজ শহরে দাঙ্গাকারীদের দেওয়া আগুনে উনিশ শতকের একটি ঐতিহাসিক সিটি হল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনে ভবনটির ঘড়ির টাওয়ার ও ছাদের অংশ ধসে পড়ে।
এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে এক বাসিন্দা বলেন, সরকারের ওপর ক্ষোভ থেকে ঐতিহ্যবাহী ভবন ধ্বংস করা সবার জন্যই ক্ষতিকর।
এদিকে প্যারিসের বিভিন্ন দোকানের সামনে ভাঙা কাচ সরাতে দেখা যায় ব্যবসায়ীদের। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সড়ক থেকে ধ্বংসাবশেষ ও আবর্জনা অপসারণ করেন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সপ্তাহান্তের বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবারের ঘটনায় প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হন, যাদের মধ্যে সাতজনের আঘাত গুরুতর।
ম্যাক্রোঁ বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে দোকানপাট ও সরকারি স্থাপনা সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান তিনি।
রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গত মাসে শুরু হওয়া আন্দোলনে শনিবার শ্রমিক সংগঠন ও সরকারের বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী যুক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং জনসেবার অবনতি নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এ আন্দোলনের অন্যতম কারণ।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। তবে তাঁর অভিযোগ, উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীর কয়েক হাজার সদস্য সরকারি স্থাপনায় হামলা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। পরে বিভিন্ন স্থানে লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিরাও তাদের সঙ্গে যুক্ত হন বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বিক্ষোভ মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশপ্রধানদের ভূমিকার সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা মেরিন ল্য পেন বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টার নিন্দা জানান।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনে মতবিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। দেশটির আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে অর্থনৈতিক চাপ, সরকারি সেবার মান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সহিংসতা বন্ধ করে জনজীবনে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা এখন ফরাসি কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দাবি বিবেচনা করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সূত্র: বিবিসি
কেকে/সাশ