বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ ঋণের বোঝা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এবং কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলন। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে অংশ নেন বিশ্বের ১৯১টি সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, উন্নয়ন অর্থায়ন বাড়ানো, দারিদ্র্য হ্রাস এবং প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়গুলো সম্মেলনের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে।
আলোচনায় উঠে এসেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা দেখালেও বর্তমান স্থিতিশীলতা ঝুঁকিমুক্ত নয়। যুদ্ধ ও সংঘাত, বাণিজ্যপথে বিঘ্ন, সরকারি ঋণের উচ্চ বোঝা, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে আইএমএফের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সরকারি অর্থব্যবস্থার ঝুঁকি কমানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সম্মেলনের সমাপনী পর্যায়ে আয়োজক দেশ থাইল্যান্ডের ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। থাই সরকারের মুখপাত্র একাপপব পিয়ানপিসেস জানান, সম্মেলন আয়োজনের সাফল্য ও দক্ষতার প্রশংসা করেছেন জর্জিয়েভা। তার মতে, এ আয়োজন থেকে অংশগ্রহণকারীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক কমিটির (আইএমএফসি) চেয়ারম্যান ও সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদানও সম্মেলন আয়োজনের উচ্চমানের প্রশংসা করেন। প্রায় ২০ হাজার অংশগ্রহণকারীকে স্বাগত জানায় থাইল্যান্ড।
আইএমএফের অগ্রাধিকার— মূল্যস্ফীতি, ঋণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা
সম্মেলনে আইএমএফের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা এবং ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি। ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও খাদ্যের সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং আর্থিক নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখাও আইএমএফের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আরও বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হতে পারে। তাই সাময়িক সংকট মোকাবিলায় সরকারি সহায়তা কর্মসূচি এমনভাবে পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে দীর্ঘ মেয়াদে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি না হয়।
বিশেষ করে জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কারের ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ভর্তুকিতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। তবে ভর্তুকি সংস্কারের পাশাপাশি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করাও নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার ঝুঁকি
প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
এআই অনেক কাজ দ্রুত ও কম খরচে সম্পন্ন করতে সক্ষম হলেও এর ফলে কিছু প্রচলিত পেশায় কর্মীর চাহিদা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের প্রবেশপর্যায়ের চাকরি এবং নিয়মিত কাজনির্ভর পেশাগুলো পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে এআইয়ের অপব্যবহারের মাধ্যমে সাইবার হামলা, ডিজিটাল জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় উঠে এসেছে। ব্যাংক অব থাইল্যান্ড, আইএমএফসহ সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের আলোচনায় ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় ‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট’ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্য কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা সমাপনী অধিবেশনে উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন মডেল গড়ে তোলা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেন। তার হিসাবে, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে ১২০ কোটি তরুণ। অথচ একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে প্রায় ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অজয় বাঙ্গা বলেন, ‘চাকরি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি মানুষের মর্যাদা।’ তিনি বলেন, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সরকারি অর্থ, বেসরকারি পুঁজি, দাতব্য সহায়তা ও প্রযুক্তিকে দেশগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে এখনো বাজারভিত্তিক বিনিয়োগ পৌঁছায়নি, সেখানে সরকারি অর্থায়ন ও স্বল্পসুদে ঋণের প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার পরিসর বাড়ানোর সুযোগ থাকলে সেই পুঁজিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ অর্থবছরে সংস্থাটির উদ্যোগে বেসরকারি খাত থেকে উন্নয়ন অর্থায়ন সংগ্রহের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে তা বেড়ে ১১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নসহ বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মোট অর্থায়ন ২৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় গুরুত্ব
কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত বিদ্যুৎ পেয়েছে ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ। একই সময়সীমার মধ্যে এক বিলিয়ন মানুষের পানির নিরাপত্তা উন্নয়ন, ৩০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষককে উৎপাদন বাড়িয়ে উদ্বৃত্ত তৈরিতে সহায়তা এবং ১৫০ কোটি মানুষের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যও রয়েছে।
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়ন এবং বাজারসংযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ডিজিটাল তথ্যের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরও দৃশ্যমান করা, বড় ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সংঘাতপ্রবণ ও দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে ক্ষুদ্র ব্যবসা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্মেলনের অর্জন কতটা
এবারের সম্মেলনের অন্যতম প্রধান অর্জন হলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং উন্নয়ন অর্থায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে আনা। আইএমএফের আলোচনায় ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, ভর্তুকি সংস্কার, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রযুক্তিগত ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং বেসরকারি পুঁজির কার্যকর ব্যবহারের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।
ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় ‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট’-এর মতো সহযোগিতামূলক উদ্যোগও সম্মেলনে গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের লক্ষ্যে ছয়টি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মধ্যে বিনিয়োগ মূল্যায়ন ও হস্তান্তরের অভিন্ন পদ্ধতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন অজয় বাঙ্গা।
তবে এসব উদ্যোগের ঘোষণাকে তাৎক্ষণিকভাবে সব দেশের জন্য নতুন অর্থায়ন বা ঋণ অনুমোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সম্মেলনে নীতিগত দিকনির্দেশনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র স্পষ্ট হলেও বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে দেশভিত্তিক সংস্কার, বিনিয়োগ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এবং প্রতিশ্রুত অর্থায়ন কার্যকরভাবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে পৌঁছানোর ওপর।
সব মিলিয়ে, ব্যাংককের এ সম্মেলন বিশ্ব অর্থনীতির সামনে থাকা ঝুঁকিগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ঋণের চাপ সামলানো, প্রযুক্তির সুফল কাজে লাগানো এবং বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
কেকে/সাশ