বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু গুলি! গাড়ির সামনে এসে উইন্ডস্ক্রিন লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছেন এক যুবক। এরপর আরেকজন এগিয়ে এসে জানলা লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছেন। খুব কাছ থেকে চালানো গুলির একটি পর্যায়ে পিস্তলটি কাজ করা বন্ধ করে দেয় বলে ভিডিও দেখে ধারণা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে হামলার দৃশ্য। তবে হামলার পরের আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আহত গাড়িচালককে নিয়ে নিজেই গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে হাসপাতালে ছুটছেন টাইগার শ্রফ। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া এই অভিনেতার গাড়ি লক্ষ্য করে পাঁচ রাউন্ড গুলি চালানোর ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে মুম্বইয়ে।
গতকাল রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ভারতের মুম্বইয়ের জুহু এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ফুটবল খেলে ক্লাব থেকে ফেরার পথে টাইগারের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালান হামলাকারীরা। এ ঘটনায় তার গাড়িচালক ও কাছাকাছি থাকা এক অটোচালক আহত হয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, টাইগার নিরাপদে আছেন। তবে বারুদের প্রভাব ও ভাঙা কাচের কারণে তার হাতে আঘাত লাগার কথা জানিয়েছেন মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে।
ভাইরাল ভিডিওতে যা দেখা যাচ্ছে :
‘অভি’ নামের একটি এক্স হ্যান্ডল থেকে প্রথম ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। তবে ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ভিডিওতে দেখা যায়, জুহু এলাকার একটি ফুটবল ক্লাব থেকে বিএমডব্লিউ গাড়িতে বের হচ্ছেন টাইগার। তিনি নিজে গাড়ি চালাচ্ছিলেন না; চালকের পাশের আসনে বসে অনুরাগীদের দিকে হাত নাড়ছিলেন। গাড়িটি ক্লাবের পার্কিংয়ের গেট পেরোতেই এক যুবক সামনে এসে পিস্তল বের করেন। এরপর গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকেন তিনি। কিছুক্ষণ পর আরও এক যুবক পিস্তল হাতে এগিয়ে এসে টাইগারের বসার পাশের জানলা লক্ষ্য করে গুলি চালান। এরপর দুইজনই তৃতীয় এক ব্যক্তির বাইকে চড়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলাকারীদের একজন গাড়ির জানলার খুব কাছে গিয়ে গুলি চালানোর চেষ্টা করলেও তার অস্ত্রটি কাজ করেনি বলে মনে হচ্ছে। পঞ্চম গুলির পর ষষ্ঠবার গুলি চালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অস্ত্রটি আটকে যায় বলে ভিডিও দেখে ধারণা করা হচ্ছে। ওই মুহূর্তে হামলাকারী টাইগারের গাড়ির জানলার একেবারে কাছে ছিলেন।
আহত চালককে নিয়ে নিজেই হাসপাতালে ছুটলেন টাইগার :
গুলি চালানোর পরের দৃশ্যও উঠে এসেছে ভিডিওতে। গাড়িচালক ফিরদৌস গুলিতে আহত হওয়ার পর গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন টাইগার সামনের যাত্রীর আসন থেকে চালকের আসনে চলে যান। এরপর আহত চালককে নিয়ে নিজের বিএমডব্লিউ গাড়ি চালিয়ে নানাবতী হাসপাতালে রওনা হন তিনি।
ভিডিওতে গাড়ি ও রাস্তার ওপর রক্তের দাগ দেখা গেছে। ঘটনাস্থলে থাকা এক নারীকে টাইগারকে দ্রুত আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলতে শোনা যায়। হামলার পরপরই টাইগারের গাড়ি ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যায়।
এ ঘটনায় শুধু টাইগারের গাড়িচালকই নন, কাছাকাছি থাকা আরেক ব্যক্তিও আহত হয়েছেন। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির বুকের নিচের দিকে গুলি লাগে। আহত অটোচালককে একটি অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শাহরুখ শেখ জানান, ফুটবল মাঠে তখন কয়েকজন অভিনেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন অপারশক্তি খুরানা, অভিষেক বাজাজ ও অভিমন্যু। সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। টাইগার তখন ভক্তদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিলেন। গাড়িটি গেট পেরিয়ে যাওয়ার পরই হামলাকারীরা গুলি চালাতে শুরু করেন।
শাহরুখ শেখ বলেন, ‘ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে তিনি হামলাকারীদের চেহারা মনে রাখতে পারেননি। হঠাৎ কয়েকটি গুলির শব্দ শুনে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, টাইগারের গাড়িচালকের হাতে গুলি লাগে।’
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি অভিনেতা ও তার গাড়িচালকের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন অনেকে।
হামলার দায় স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের :
এ হামলার দায় স্বীকার করেছে বিষ্ণোই গ্যাং। অনিল পণ্ডিত নামে এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে হামলার দায় স্বীকার করেছেন। সেখানে হারমান সন্ধুর নামও এসেছে। তারা লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
অনিল পণ্ডিত, হারমান সন্ধু ও শুভম লঙ্কার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় রয়েছেন। তারা বলিউড অভিনেতা সালমান খানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে বাবা সিদ্দিকি হত্যা মামলার সঙ্গেও আলোচনায় এসেছিলেন। তবে এসব তথ্যের বিষয়ে পুলিশের চূড়ান্ত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও বার্তায় নিজেকে অনিল পণ্ডিত পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, তিনি লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ছোট ভাইয়ের মতো। টাইগার শ্রফের ওপর হামলার দায় তিনি ও হারমান সন্ধু নিচ্ছেন বলেও দাবি করেন ওই ব্যক্তি।
হিন্দিতে দেওয়া বার্তায় বলা হয়, টাইগারকে আগে ফোন করে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কথা না শোনায় হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই বার্তায় আরও হুমকি দিয়ে বলা হয়, মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির যারা তাদের কথা শুনবেন না এবং সালমান খানের সঙ্গে কাজ করবেন, তারাও পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারেন।
সালমান খানকে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং একাধিকবার হত্যার হুমকি দিয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। টাইগার শ্রফের ওপর হামলার সঙ্গে সালমান খানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসায় ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পালানোর বাইক জব্দ, তদন্তে পুলিশ :
হামলার পর অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত শুরু করেছে মুম্বই পুলিশ। হামলাকারীরা যে বাইকে চড়ে পালিয়েছিলেন, সেটি জব্দ করেছে পুলিশ। জুহু থেকে আন্ধেরি পর্যন্ত ওই বাইকের যাতায়াতের তথ্যও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, বাইকটি মুম্বইয়েরই। এটি পালসার মডেলের এবং এর আগে তিনবার বিক্রি হয়েছিল।
পুলিশের ধারণা, আন্ধেরি স্টেশনে যাওয়ার পর অভিযুক্তরা ট্রেনে চড়ে পালিয়ে যান। তাদের শনাক্ত করতে বাইকের নম্বরপ্লেট ও চেসিস নম্বরের সূত্র ধরে অনুসন্ধান চলছে। পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। অভিযুক্তরা গণপরিবহন ব্যবহার করে পালিয়ে থাকতে পারেন—এমন আশঙ্কায় মুম্বই থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেন ও বাসেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
এ ঘটনায় একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তবে তার পরিচয় ও হামলায় সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। হামলাকারীদের খুঁজে বের করতে পুলিশ ১৫টি দল গঠন করেছে।
পুলিশ প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য রেকর্ড করছে। আহত অটোচালক উমেশ চাভানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দুই প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যও নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি টাইগারের গাড়িচালকের বক্তব্য রেকর্ড করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
টাইগারের সঙ্গে দেখা করলেন উপমুখ্যমন্ত্রী :
ঘটনার পর মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবিস টাইগার শ্রফের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। অভিযুক্তদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
রোববার রাতেই টাইগারের বাড়িতে গিয়ে অভিনেতার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে।
পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা। পাঁচ রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছে। তবে সৌভাগ্যবশত টাইগার নিরাপদে রয়েছেন। তার গাড়িচালক আহত হয়েছেন। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’
শিন্ডে জানান, গুলিতে সরাসরি আঘাত না লাগলেও বারুদের প্রভাব ও ভাঙা কাচের টুকরোর কারণে টাইগারের হাতে চোট লেগেছে। এ ঘটনায় অভিনেতা ও তার মা দুইজনই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
টাইগারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর শিন্ডে বলেন, ‘আমি টাইগারের সঙ্গে দেখা করেছি। বারুদ ও কাচের টুকরোর কারণে তার বাঁ হাতে (ডান হাতে) আঘাত লেগেছে। টাইগার এবং তার মা, দুইজনেই যথেষ্ট আতঙ্কিত।’
ঘটনার পর টাইগারের বাড়ির বাইরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও হামলার পেছনের কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
সূত্র : এনডিটিভি, আনন্দবাজার পত্রিকা।
কেকে/এমএ