প্রবাসে বাড়ছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যু। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে— মৃত্যুর সংখ্যাটা উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৭৩৬ জন প্রবাসীর মরদেহ। অর্থাৎ, এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ জন প্রবাসী ফিরেছেন নিথর দেহে। এ তথ্যটি জানিয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহনুর আহমেদ।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। এদিকে বিদেশে মারা যাওয়ার পর প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনা নিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্বজনদের। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি বলছে, বিদেশে প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। সৌদি আরবে কিছু কর্মীকে দাফন করা হয় স্থানীয়ভাবে। তবে অধিকাংশ মরদেহ দেশে আনতে চায় পরিবার। নিয়মিত কর্মী হলে মরদেহ মোটামুটি সময়মতো দেশে আসে। কিন্তু কর্মী কোনো কারণে অনিয়মিত হয়ে গেলে (বৈধ কাগজ না থাকা) দীর্ঘ সময় লেগে যায় মরদেহ আনতে। ফলে এ নিয়ে স্বজনদের মাঝেও তৈরি হয় আক্ষেপ ও হতাশা।
তাদের ভাষ্যমতে— পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে কেউ বিক্রি করেন শেষ সম্বল, কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে পাড়ি জমান বিদেশে। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের আয় পাঠান দেশে। কিন্তু সেই প্রবাসীর জীবন থেমে গেলে মরদেহ ফিরিয়ে আনতেও স্বজনদের পোহাতে হয় দুর্ভোগ। প্রবাসীদের চাঁদার টাকায় দেশে আসে অধিকাংশ মরদেহ। পরিবারের অভিযোগ, কখনো অপেক্ষা করতে হয় ২০ থেকে ৩০ দিন; খরচ জোগাতে নিতে হয় অন্য প্রবাসীদের সহায়তা।
চলতি মাসের ২৬ অক্টোবর ভোর থেকেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আট নম্বর গেটের সামনে জড়ো হন পরিবারের সদস্যরা। সেদিন সৌদি আরব ও দুবাই থেকে আসে ১৩ জন প্রবাসীর মরদেহ। এরমধ্যে মরদেহ নিতে আসা স্বজনদের একজন শিল্পী বেগম। বাড়ি কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার বৈদ্যনাথপুর গ্রামে। প্রায় দুই বছর আগে তার স্বামী জাকির হোসেন পাড়ি জমান দুবাইয়ে। স্ত্রীকে বলেছিলেন, কাজ না পেলে ফিরে আসবেন। অনেক কষ্টে একটি কাজও জুটেছিল। কিন্তু সংসারে স্বস্তি ফেরার আগেই আসে মৃত্যুর খবর। পরিবারের ভাষ্য, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান জাকির। ফিরলেন তিনি। তবে কফিনে। দুই সন্তানকে নিয়ে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে শিল্পী বেগম।
স্বজনদের অভিযোগ— মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০ থেকে ৩০ দিন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিংবা বৈধ আকামা না থাকলে জটিলতা আরও বাড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মরদেহ পাঠানোর খরচ জোগাতে এগিয়ে এসেছেন সহকর্মী ও অন্য প্রবাসীরা— চাঁদা তুলে।
যদিও মৃত প্রবাসী কর্মীর পরিবারকে সহায়তার সরকারি ব্যবস্থাও রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরে মরদেহ হস্তান্তরের সময় দেশে পরিবহন ও দাফনের খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই ও প্রযোজ্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মৃত কর্মীর পরিবারকে তিন লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে সে খবর জানে না অনেকেই।
প্রবাসে বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর চিত্র উঠে এসেছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পরিসংখ্যানেও। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী— ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ১৮ হাজার ১৬৬ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৬৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া ও বৈদ্যুতিক শকের মতো ঘটনায়। সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ৬৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। অর্থাৎ, ওই পাঁচ বছরে দেশে আসা মোট মরদেহের ২০ শতাংশের বেশি ছিল বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নিহত কর্মীদের।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যানেও প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির চিত্র দেখা যায়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৫৫২ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮১৩-তে। আর ২০২৫ সালে দেশে এসেছে ৫ হাজার ৩৮ জনের মরদেহ। অর্থাৎ, টানা তিন বছরেই দেশে আসা মরদেহের সংখ্যা বেড়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়ানো হয়েছে। মৃতদেহ দ্রুত দেশে আনতে কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। যারা অনিয়মিত কর্মী তাদের মরদেহ আনতেও সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বিদেশে মৃত্যুর কারণ যাচাই করতে করণীয় ঠিক করা হবে।
কেকে/এআই