দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার যেন কোনোভাবেই আর নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। একে একে চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি থেকে শুরু করে মাছ-মাংস—প্রায় প্রতিটি খাতেই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জনজীবন।
সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নজরদারি ও বাজার মনিটরিংয়ের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও সিন্ডিকেট ও কারসাজির দৌরাত্ম্যে সব পণ্যের দাম এখন সাধারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে। এর ফলে সীমিত আয়ের মানুষদের দৈনিক বাজারে গিয়ে বাজেট মেলাতেই নাভিশ্বাস উঠছে, আর বাজারের এই বেসামাল পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে সব মহল থেকে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানের চাল কিনতেই যেখানে নিম্নবিত্তের হিমশিম অবস্থা, সেখানে ভালো মানের চালের দাম মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। পাশাপাশি সব ধরনের শাকসবজি এখন চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। বেশিরভাগ সবজির কেজিই এখন সাধারণ ক্রেতার ক্রয়সীমা ছাড়িয়ে গেছে। পেঁয়াজ, রসুন ও আদার বাজারেও রয়েছে অস্থিরতা। মুরগি ও গরুর মাংসের দাম বাড়তি থাকায় পাতে আমিষের জোগান দেওয়াও এখন অনেকের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। তেল, চিনি ও ডালের মতো রান্নার অপরিহার্য উপাদানগুলোর দামও ঊর্ধ্বমুখী।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কার্যকর তদারকির ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটিই মূলত দায়ী। খুচরা ও পাইকারি বাজারের মধ্যকার বিশাল ব্যবধান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট বাজারকে জিম্মি করে ফেলেছে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে বাজার স্থিতিশীল করা অসম্ভব। যদিও মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা টাস্কফোর্সের অভিযান পরিচালিত হয়, তবে তা কেবল সাময়িক স্বস্তি আনলেও দীর্ঘমেয়াদে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কোনো স্থায়ী ভূমিকা রাখতে পারছে না।
ভোজ্যতেলে নতুন করে অস্থিরতা :
নানা অজুহাতে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ভোজ্য তেলের দামের অস্থিরতা। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার এবং পরিবহন ব্যায় বৃদ্ধির অজুহাত সামনে এনে বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে আরও ১৪ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ভোজ্যতেল উৎপাদন ও পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো। দুই মাসেরও কম সময় আগে একবার দাম সমন্বয় করা হলেও, রমজানকে সামনে রেখে পরিশোধনকারীদের এই নতুন মূল্যবৃদ্ধির চাপ এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির গুঞ্জনে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে বাজারে বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২০৪ টাকা। এখন সেই দাম বাড়িয়ে ২১৮ টাকা করতে চায় কোম্পানিগুলো। এ ছাড়া ৫ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতলের দাম ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৭০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করার আবেদন জানিয়েছে তারা। দেশের বাজারে সর্বশেষ ২ সেপ্টেম্বর ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এর আগে এক লিটারের বোতলের দাম ছিল ১৯৯ টাকা।
শীতের সবজি বাজারে উঠলেও দাম চড়া :
বাজারে শীতের আগাম সবজির সরবরাহ বাড়ছে। নতুন আলু, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি আর মুলা দেখে ক্রেতার আগ্রহ বাড়ছে, কিন্তু দাম এখনো চড়া। শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় পুরনো সবজির দামে প্রভাব পড়লেও বেশিরভাগই কিনতে হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ টাকা দরে। গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল, কৃষি মার্কেট ও রায়েরবাজার সাদেক খান কাঁচাবাজার ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
সারা বছর মিললেও শীতের আগাম টমেটো বাজারে আসায় এ সবজির দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি টমেটো ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হলেও শুক্রবার ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছিল। অর্থাৎ, দাম কমলেও নতুন আলু, শিম ও টমেটো এখনো অল্প ও সীমিত আয়ের মানুষের নাগালে আসেনি।
মোহাম্মদপুর টাউন হল কৃষি মার্কেটের পাইকারি সবজির আড়ত ‘মেসার্স ফাহিম এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী আরিফ হোসেন বলেন, “নতুন শিম, আলু আর মুলা বাজারে এলেও এখনও পুরোপুরি নামেনি বাঁধাকপি। পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে সব ধরনের শীতকালীন সবজি চলে আসবে।”
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের প্রধান গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে খুচরা সবজির জমজমাট বাজার। সেখান থেকে নতুন আলু ও শিম কিনছিলেন আদাবর এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা এস এম নাজমুল হাসান। তিনি বলেন, “বাজারে নতুন শীতের সবজি দেখে বেশ ভালোই লাগছে। তবে দাম এখনো বেশ চড়া। পকেটের কথা ভেবে অল্প করেই শিম আর আলু কিনলাম; দাম একটু নাগালে আসলে পরিমাণ বাড়িয়ে দেব।”
বেশির ভাগ সবজির দাম ৮০ টাকা :
গতকাল বাজারে ঝিঙা, কচুরমুখী, পটোল, বেগুন ও কাঁকরোল প্রতি কেজি ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত সপ্তাহে বেগুন ও কাঁকরোলের দাম ছিল ১০০ টাকা। অর্থাৎ এ দুই সবজির দাম কেজিতে কমেছে ২০ টাকা।
বিক্রেতাদের ভাষ্য, শীতের সবজি পুরোপুরি বাজারে আসার আগ পর্যন্ত পটোল, বেগুন, ঝিঙা, বরবটি, লাউ ও ঢ্যাঁড়সের মতো গ্রীষ্মকালীন সবজিই ক্রেতাদের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করছে। নতুন সবজির সরবরাহ বাড়লে পুরোনো সবজির ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাবে পণ্যমূল্য বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ :
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং খাদ্যশস্য পরিবহনে বাধার কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির আশঙ্কা, যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। গত বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বেড়ে ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলারে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। ২০২০ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বাদ দিলে গত চার দশকের মধ্যে এটি হবে সরবরাহ কমার সবচেয়ে বড় ঘটনা। খাদ্যপণ্যের দাম এ বছর ১০ শতাংশের কিছু বেশি বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে আরও ৭ শতাংশের বেশি বাড়লে দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে প্রায় ১৮ শতাংশ। কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত সারের দামও এ বছর ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনে বাধা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব খাদ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে তীব্র এল নিনোও পরিস্থিতি তৈরি হলে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যের দাম পূর্বাভাসের চেয়ে আরও ১২ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি ও চরম দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, সরবরাহে বিঘ্ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগের চাহিদা বাড়ায় ধাতুর দাম এ বছর ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে। অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে স্বর্ণের মতো নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত মূল্যবান ধাতুর দাম বাড়তে পারে ৪০ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, একসঙ্গে একাধিক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে পণ্যের বাজার। জ্বালানির বাড়তি খরচ ও বাণিজ্যে বিঘ্ন নানা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। এতে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ বাড়তে পারে। সংস্থাটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫টি দেশকে এরই মধ্যে ৮৭০ কোটি ডলারের স্বল্প সুদের ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
কেকে/ এমএস