সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের শ্রমবাজারে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কর্মী পাঠানোর দিক থেকে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। অথচ বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অন্যতম বড় অংশীদার জাপান। দেশটিতে যেমন রপ্তানি বাড়ছে, তেমনি এর শ্রমবাজার নিয়েও রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। কিন্তু দক্ষতা ও গুরুত্ব না বোঝার কারণে হোঁচট খাচ্ছে বাংলাদেশ।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও বলছে, জাপানের শ্রমবাজারে পিছিয়ে থাকার পেছনে ভাষাগত দুর্বলতা ও খাতভিত্তিক দক্ষতার চরম অভাব রয়েছে। সরকারকে এর গুরুত্ব বুঝে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে। সরকারি অনুমোদন নিয়ে গত ৩ বছরে দেশটিতে গিয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ১৮১ জন। এর মধ্যে চলতি অক্টোবর পর্যন্ত গিয়েছেন সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮২২ জন। তবে আগামী ৫ বছরে ১ লাখ দক্ষ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বর্তমান সরকার।
ভাষাগত দক্ষতা ও খাতভিত্তিক প্রশিক্ষণে দুর্বলতা :
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত ভাষাগত দুর্বলতা ও খাতভিত্তিক দক্ষতার অভাব থাকার কারণে আমাদের দেশের কর্মীরা জাপান যেতে পারছেন না। এরা আবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেতে পারছেন। কারণ, জাপানে অদক্ষ কর্মী যাওয়ার সুযোগ নেই। অন্যান্য দেশে কর্মী পাঠানোর পর অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু জাপানের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। সেখানে একবার যাওয়ার পর একজন কর্মী পাঁচ বছরের জন্য থাকতে পারবেন এবং একটানা পাঁচ বছর সেখানে অবস্থান করতে পারবেন।
তারা বলেন, সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের দেশ থেকে যেভাবে কর্মী পাঠানো হচ্ছে, তা পর্যাপ্ত নয়। আমাদের দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও শুধু দক্ষতার অভাবে জাপানে পাঠানো যাচ্ছে না। অথচ বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক কর্মী জাপানে যাচ্ছে। আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।
প্রস্তুতির পর্যায়েই পিছিয়ে পড়েন অনেকে :
জাপানি ভাষা শেখা, পেশাগত দক্ষতা অর্জন এবং যোগ্যতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সময়সাপেক্ষ। প্রশিক্ষণকেন্দ্রের গুণগত মানে অসামঞ্জস্য থাকলে এবং প্রশিক্ষণের পর চাকরির বাস্তব সুযোগ না থাকলে তরুণদের সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হয়। ফলে জাপানে যেতে আগ্রহী অনেকেই প্রস্তুতির পর্যায়েই পিছিয়ে পড়েন। এতে করে তাদের স্বপ্নও থেমে যায়।
টেকসই কর্মসংস্থানে পিছিয়ে তরুণ জনগোষ্ঠী :
জাপানি ভাষায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট খাতের (যেমন—কৃষি, নির্মাণ, কেয়ার গিভিং, আতিথেয়তা) কারিগরি প্রশিক্ষণ না থাকায় প্রার্থীরা বাছাই প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে পড়েন। আবার বাজারের প্রকৃত চাহিদা না বুঝে শুধু সার্টিফিকেটসর্বস্ব বা অপরিকল্পিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো প্রশিক্ষণ ও বাস্তব নিয়োগের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা। কোন খাতে কতজন কর্মী প্রয়োজন, নিয়োগকর্তারা কী যোগ্যতা চান এবং কোন দক্ষতার পরীক্ষা পাস করতে হবে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করার কথা। কিন্তু প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সংখ্যা, প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা কিংবা সনদ বিতরণকে সাফল্য হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রকৃত ফলাফলকে আড়াল করেছে। এখানে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে কাজ করতে হবে।
ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ও নীতিগত ব্যর্থতা :
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানের শ্রমবাজারে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রত্যাশিত অনুযায়ী কর্মী পাঠাতে পারছে না। বার্ধক্যজনিত শ্রমিক সংকটের কারণে জাপান বর্তমানে কেয়ার গিভিং, নির্মাণ, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও আতিথেয়তাসহ ১৪টি নির্দিষ্ট খাতে বিদেশি কর্মী নিচ্ছে। তবে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এবং নীতিগত ব্যর্থতার কারণে এই বিশাল শ্রমবাজার ধরা যাচ্ছে না। আবার জাপানি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বা নেটওয়ার্ক তৈরিতে নীতি-নির্ধারকদের দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে।
প্রশ্ন হলো—জাপানি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলে তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ চালু করতে বাংলাদেশ এতদিন যথেষ্ট উদ্যোগী ছিল না কেন? বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুমাননির্ভরভাবে নয়, তথ্যভিত্তিকভাবে নির্ধারণের সক্ষমতা কেন তৈরি হয়নি? এ ব্যর্থতা কোনো ব্যক্তির নয়; এটি নীতি-নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা বা ব্যর্থতা। এ জায়গাগুলো এখন আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। এই ক্ষতগুলো দ্রুত সারিয়ে তুলতে হবে।
প্রতিযোগীদের গুরুত্ব বুঝতে কৌশল নেওয়া :
জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশ একা নয়। অন্যান্য প্রেরণকারী দেশও ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিনের শ্রম অভিবাসনের অভিজ্ঞতা, প্রতিষ্ঠিত নিয়োগ-যোগাযোগ এবং জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতির সুবিধা পায়। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত—প্রতিযোগী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে নিজেদের দুর্বলতা চিহ্নিত করা। কোন খাতে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আছে, কোথায় প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে এবং কীভাবে নিয়োগকর্তার আস্থা অর্জন করা যায়—এসব বিষয়ে ধারাবাহিক কৌশল গ্রহণ করা।
৫ বছরে ১ লাখ দক্ষ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা :
জাপানের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি ও বিভিন্ন দেশের বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আনসার-ভিডিপিসহ প্রশিক্ষিত জনবল প্রস্তুত করছে সরকার। আগামী ৫ বছরে জাপানে ১ লাখ দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলছে। কারণ দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই ৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ দক্ষ ও অর্ধদক্ষ কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এসব বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের দেশের মানুষ জাপানে যেসব চাকরি বা কাজ করতে আগ্রহী, সেই অনুযায়ী কর্মী প্রস্তুত করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্রকে বেসরকারি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তুত করা হচ্ছে। আমরা আশাবাদী, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের মধ্যদিয়ে আমাদের শ্রমবাজারেও নতুন গতি আসবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কর্মী প্রেরণ ও গ্রহণসংক্রান্ত নতুন সমঝোতা বা চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে নতুন করে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
কেকে/ এমএস