প্রতিদিন গড়ে প্রায় ষোলোজন বাংলাদেশি কর্মী নিথর দেহে দেশে ফিরছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে এসেছে ৪ হাজার ৭৩৬টি মরদেহ। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের হিসাবে ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৫২, ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৮১৩ এবং ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৩৮। টানা তিন বছর ধরে সংখ্যা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তবে যেটুকু হিসেব আনুষ্ঠানিক সেটিই খুব আতঙ্কজনক। এই মৃত্যু একটি নীরব মানবিক বিপর্যয়ের দলিল।
যারা ফিরছেন, তারা এ দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি। কেউ শেষ সম্বল বিক্রি করে, কেউ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাড়ি জমান বিদেশে। হাড়ভাঙা শ্রমের আয় দেশে পাঠিয়ে তারা সংসার ও রাষ্ট্রের রিজার্ভ সচল রাখেন। অথচ জীবনাবসানের পর সেই মানুষের মরদেহ আনতে স্বজনদের অপেক্ষা করতে হয় ২০ থেকে ৩০ দিন। অনেক ক্ষেত্রে খরচ জোগাতে হয় সহকর্মী প্রবাসীদের চাঁদায়। কুমিল্লার জাকির হোসেনের স্ত্রী শিল্পী বেগমের মতো অসংখ্য পরিবার দুই সন্তান নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
এই দুর্ভোগকে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা বললে সত্যের অর্ধেক বলা হয়। এর শেকড় আরও গভীরে। বৈশ্বিক শ্রমব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিক সস্তা পণ্যের মতো আমদানি হয়, কিন্তু তার জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদার দায় কেউ নেয় না। কাফালা-জাতীয় স্পনসরশিপ ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার ওপর শ্রমিকের নির্ভরতা এতটাই প্রবল যে, কাগজ বা আকামা না থাকলে তিনি রাষ্ট্রহীন মানুষের মতো অসহায় হয়ে পড়েন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-র মৌলিক নীতিমালা এবং ১৯৯০ সালের জাতিসংঘ অভিবাসী শ্রমিক সনদ প্রতিটি শ্রমিকের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করার কথা বলে। কিন্তু শ্রমশক্তি আমদানিকারক ধনী দেশগুলোর অধিকাংশই এসব সনদে স্বাক্ষর করেনি, কিংবা করলেও বাস্তবে মানে না। আন্তর্জাতিক আইনের এই দুর্বলতাই কাঠামোগত জুলুমের ভিত্তি। তবে এই বাস্তবতার দোহাই দিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
২০১৮ থেকে ২০২২ সালে দেশে আসা ১৮ হাজার ১৬৬ মরদেহের মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি ছিল সড়ক, কর্মস্থল বা অন্যান্য দুর্ঘটনায় নিহতদের। এর মানে নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি আছে। কল্যাণ বোর্ড মরদেহ হস্তান্তরের সময় ৩৫ হাজার টাকা এবং শর্ত সাপেক্ষে তিন লাখ টাকা অনুদান দেয়, কিন্তু অনেক পরিবারই এ সুবিধার কথা জানে না। সুবিধা থাকা এক কথা, তা মানুষের কাছে পৌঁছানো আরেক কথা।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়ানো হয়েছে এবং মরদেহ দ্রুত দেশে আনতে কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। অনিয়মিত কর্মীদের মরদেহ আনার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেছেন। বিদেশে মৃত্যুর কারণ যাচাইয়ে করণীয় ঠিক করার কথাও বলেছেন। এসব ঘোষণা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান আমরা বহুবার দেখেছি। তাই প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়বদ্ধ কাঠামো ও প্রকাশ্য জবাবদিহি।
ফলে এই পরিস্থিতিতে জরুরি গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে মরদেহ প্রেরণের সর্বোচ্চ সময়সীমা ও খরচ বহনের দায় নিয়োগকর্তার ওপর বাধ্যতামূলক করা। দূতাবাস ও শ্রম উইংয়ে বিশেষ ‘মরদেহ ব্যবস্থাপনা সেল’ গঠন এবং অনিয়মিত কর্মীদের ক্ষেত্রেও সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা। প্রতিটি মৃত্যুর স্বাধীন কারণ-অনুসন্ধান এবং তথ্য প্রকাশ।
অনুদান ও সুবিধার তথ্য রওনা হওয়ার আগের প্রশিক্ষণেই বাধ্যতামূলকভাবে জানানো এবং আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করা। আইএলও ও জাতিসংঘের মঞ্চে শ্রমিক-প্রেরণকারী দেশগুলোর জোট গড়ে অভিবাসী শ্রমিক সনদ কার্যকরে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো। একজন শ্রমিক শ্রম দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করেছেন, মৃত্যুর পর তার প্রতি রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব পালন না করা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, নৈতিক ব্যর্থতাও। আর যে বিশ্বব্যবস্থা শ্রমিকের শ্রম শোষণ করে, তার জীবনের দায় এড়িয়ে যায়, সে ব্যবস্থাও কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর যোগ্য। সেই জবাব দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের, গন্তব্য দেশগুলোর এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। এ দায় আর এড়ানোর সুযোগ নেই।
কেকে/ এমএস