যমুনার ভাঙনে বারবার বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়েছেন। নতুন করে ঘর বেঁধে জীবন শুরু করলেও অনিশ্চয়তা পিছু ছাড়েনি। অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার চরাঞ্চলের নারীরা এখন ছাগল-ভেড়া পালন ও সবজি চাষের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। ছোট পরিসরের এসব উদ্যোগে বাড়ছে তাদের আয়, তৈরি হচ্ছে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ।
কেউ তিনটি ভেড়া দিয়ে শুরু করে এখন সাতটির মালিক। কারও ঘরে রয়েছে নয়টি ভেড়া। আবার পাঁচটি ছাগল দিয়ে শুরু করে সাফিয়া বেগমের খামারে এখন ছাগলের সংখ্যা ২০টি। বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করেও কেউ কেউ আয় করছেন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।
উপজেলার নিশ্চিন্তপুর ইউনিয়নের গোয়াল বাতান চরের মমতা খাতুন দুই দফা নদীভাঙনে হারিয়েছেন বসতভিটা। নতুন করে ঘর বাঁধার সংগ্রামের মধ্যেই তিনটি ভেড়া দিয়ে শুরু করেন পশু পালন। যত্নে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে সাতটি। পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি চাষ করছেন। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত সবজি বিক্রি করে বাড়তি আয় হচ্ছে তাঁর।
মমতা খাতুন বলেন, দুইবার নদীভাঙনে বাড়িঘর হারিয়েছেন। ভেড়া পাওয়ার পর স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগোচ্ছেন। নিজের চাহিদা মিটিয়ে সবজি বিক্রির টাকাও সংসারে কাজে লাগছে।
নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়নের উত্তর রেহাইশুড়িবেড় গ্রামের ফেরদৌসী বেগমের স্বামীর জমিও বিলীন হয়েছে নদীগর্ভে। একসময় সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হতো। বর্তমানে তাঁর ঘরে রয়েছে নয়টি ভেড়া। এর মধ্যে কয়েকটি বিক্রি করে পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়েছেন।
একই ইউনিয়নের সাফিয়া বেগমের সংগ্রামও নদীভাঙন ঘিরে। একসময় অন্যের জমিতে ঘর তুলে বসবাস করতে হয়েছে তাঁকে। পাঁচটি ছাগল দিয়ে পশু পালন শুরু করেন। ধীরে ধীরে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০টিতে। ছাগল বিক্রির টাকা জমিয়ে চরে ১০ শতক জমিও কিনেছেন তিনি।
অন্যদিকে, খাসরাজবাড়ী ইউনিয়নের গোদারেবাগ চরের বুলবুলি বেগম বসতবাড়ির অব্যবহৃত জায়গায় সবজি চাষ করছেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে উৎপাদন শুরু করেন তিনি। এ বছর সবজি বিক্রি করে পেয়েছেন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এতে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সংসারের খরচেও সহায়তা হচ্ছে।
চরাঞ্চলের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে উত্তরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত ৮৬টি এলাকা ও নদীবিধৌত চরাঞ্চলে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে নারীদের বিনামূল্যে ভেড়া বিতরণ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক নন্দ দুলাল জানান, নারীদের স্বাবলম্বী করতে প্রকল্পের আওতায় ৭২০টি ভেড়া বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কাজীপুরের চরাঞ্চলে দেশি ভেড়ার সঙ্গে উন্নত জাতের ভেড়ার প্রজননের মাধ্যমে উন্নত জাত তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কাজীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শরিফুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের বসতবাড়িতে আধুনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষের জন্য নারীদের বিনামূল্যে সার ও বীজ দেওয়া হয়েছে। এতে তাঁরা পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত সবজি বিক্রি করে আয় করতে পারছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. দিদারুল আহসান জানান, চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত চারণভূমি থাকায় ভেড়া পালন লাভজনক। উপজেলায় বর্তমানে ১৫ হাজার ৭০০টি ভেড়া রয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৪২০টি চরাঞ্চলে পালন করা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, চরাঞ্চলের নারীদের স্বাবলম্বী করতে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
তবে নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকির পাশাপাশি পশুর রোগবালাই, চিকিৎসাসেবা, উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে নারীদের উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়েও থেমে নেই কাজীপুরের চরাঞ্চলের নারীরা। কয়েকটি ছাগল-ভেড়া আর বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষকে অবলম্বন করে তারা নতুন করে জীবন গড়ছেন। তাদের এই উদ্যোগ শুধু সংসারে বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করছে না, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।
কেকে/সাশ