নিত্যব্যবহার্য ভোজ্যতেল ও সিলিন্ডার গ্যাসের সরবরাহ সংকট ও দাম এমনিতেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। যখন-তখন এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে আবারও দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। দেশের অর্থনৈতিক ও শিল্প খাতের বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করছে এসব সংকট। ফলে সরকারের উন্নয়নমূলক এবং অবকাঠামোগত অনেক অর্জন সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগের কাছে মলিন হয়ে পড়ছে।
কারণ, সাধারণ মানুষ পকেটের খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে সরকারের উন্নয়ন ও দেশ গঠনের অনেক ইতিবাচক ভাবনাও ম্লান হয়ে পড়ে।
জীবন-যাপন নিয়ে সাধারণ মানুষ যেখানে ক্ষুব্ধ, সেখানে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৪ টাকা ও ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৩০০ টাকা বৃদ্ধির নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অথচ গত মাসেই ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ২৫১ টাকা বাড়ানো হয়। ফলে আগামী দিনের জীবন-যাপন নিয়ে চিন্তিত বলে অনেকেই অভিযোগ করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। এতে করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে সরকারের অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক কাজের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। তেল ও গ্যাসের বাড়তি খরচ জোগাতে সাধারণ মানুষের এমনিতেই নাভিশ্বাস অবস্থা। তার মধ্যে নতুন করে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব সাধারণ মানুষের ওপর ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারা বলেন, সরকারকে দেশ গঠন যেমন করতে হবে। তেমনি সাধারণ মানুষের মনের কথাও বুঝতে হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রের ব্যবসায়ী যখন-তখন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। এর অনেকটাই সরকার দেখেও দেখে না। তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। হলেও তা যৎসামান্য।
বাজার সিন্ডিকেট না ভাঙায় উদ্বেগ
নিত্যপণ্য, ওষুধ, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার দাবি বহুদিনের। কিন্তু সরকার আসে সরকার যায়। সিন্ডিকেট ভাঙে না। এর মাশুল দিতে হয় সাধারণ জনগণকে। বাজার নিয়ে কাজ করা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশও (ক্যাব) এসব বিষয়ে সরব থাকে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
ক্যাবের সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, সরকারের কাছে জনবান্ধব সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা থাকলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের চাপ সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে। ভোজ্যতেলের দামও আবার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাজারে সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য থাকছে না, ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তীব্রভাবে সংকুচিত হচ্ছে। ডিজেল, কেরোসিন ও গ্যাসের দাম বাড়ার ফলে বাসভাড়া ও সামগ্রিক যাতায়াত খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। আবারও তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে সরকারকে আরও পরিকল্পিত হতে হবে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিরসনে কাজ করতে হবে।
সংকট উত্তরণ ও নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান
সংকট উত্তরণ ও নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন খাতের চলমান সংকট মোকাবিলা এবং বাজার, অর্থনীতি কিংবা জননিরাপত্তা রক্ষায় এই সমন্বিত পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও অবৈধ মজুতদারি বন্ধে পাইকারি ও খুচরা বাজারে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন বলেন, মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ধনীদের তুলনায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অনেক বেশি পড়ছে। সরকারকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, কৃত্রিম সংকট নিরসন করতে হবে এবং বিকল্প বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।
ক্যাবের সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, সামনে রমজান মাস। এটি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে এখনই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ১৮ কোটি মানুষের দাবি বিবেচনায় নিয়ে জনবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
কেকে/সাশ