হাসপাতালের করিডরে স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস আর নিথর দেহগুলো যেন আজ এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে নেওয়া একের পর এক মশানিধন কার্যক্রম, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন আর চিকিৎসকদের রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রম—কোনো কিছুতেই যেন থামানো যাচ্ছে না ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা। প্রতিদিন সকালে হাসপাতালের বিছানা থেকে আসছে কোনো না কোনো তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার সংবাদ।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের অক্টোবর মাসটি ডেঙ্গুর ইতিহাসে অন্যতম ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৪১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে কেবল বিদায়ঘণ্টা বাজতে চলা চলতি অক্টোবর মাসেই মারা গেছেন ১৭৩ জন, যা চলতি বছরের মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। সরকারি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আর লাখো মানুষের আর্তনাদের মাঝেও কেন এভাবে প্রদীপ নিভে যাচ্ছে তা নিয়ে আজ প্রশ্ন উঠেছে জনমনে।
লার্ভা নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, টাস্কফোর্সের নজরদারি কিংবা চিকিৎসকদের রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রমÑসরকারের এত এত চেষ্টার পরও থামানো যাচ্ছে না ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা। সরকারি প্রতিরোধমূলক সব ব্যবস্থা ও কড়া পদক্ষেপের মাঝেও কেন এভাবে নিভে যাচ্ছে অমূল্য প্রাণগুলো, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে জনমনে।
মৌসুম শেষেও ডেঙ্গুর দাপট, বাড়ছে সংক্রমণ-মৃত্যু
সাধারণত বর্ষা মৌসুমেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা গেলেও চলতি বছর মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসেও কমছে না এর ভয়াল দাপট। উল্টো দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক মশা নিধন কার্যক্রমের ঘাটতি এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করার কারণে পরিস্থিতির দ্রæত উন্নতি হচ্ছে না।
ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৩ মৃত্যু, হাসপাতালে ১২৬২
দেশে গত এক দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ১ হাজার ২৬২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর এ নিয়ে ডেঙ্গুতে মোট ৪১৮ জনের প্রাণ গেল। এর মধ্যে অক্টোবর মাসেই প্রাণ গেছে ১৭৩ জনের। আর হাসপাতালে ভর্তি রোগী বেড়ে দাঁড়াল ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৬৭ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শুক্রবার জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া তিনজনই ঢাকা বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
এই সময়ে ঢাকা বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৩৫ জন, চট্টগ্রামে ২৬৮ জন, খুলনায় ২৩১ জন, ময়মনসিংহে ৭৫, রাজশাহীতে ১১২, রংপুরে ৪৮, সিলেটে ১১ জন ও বরিশালে ১৮২ জন ভর্তি হন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। গত বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৪ শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজারের বেশি।
আক্রান্ত-মৃত্যুতে যেন সমান প্রতিযোগিতা
চট্টগ্রামে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর এই দুই মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখা গেছে। এ সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মৃত্যুও। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে এই দুই মাসজুড়েই দেখা গেছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। সব মিলিয়ে, ডেঙ্গুর দাপটে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বন্দরনগরীর মানুষ।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম জেলায় সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৩০ জন এবং মারা গেছেন ১৬ জন। অপরদিকে অক্টোবর মাসে ১ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৫২৫ জন এবং মারা গেছেন ১৪ জন।
সিভিল সার্জন কার্যালয় চট্টগ্রাম নগর, ১৫টি উপজেলার পাশাপাশি আশপাশের অন্যান্য জেলা থেকে আগত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের তথ্য সংরক্ষণ করে। সে হিসেবে, সেপ্টেম্বরে মোট আক্রান্ত ২ হাজার ৪৩০ জনের মধ্যে নগরীর ১ হাজার ১৬৬ জন, ১৫টি উপজেলার ১ হাজার ৪৮ জন ও অন্যান্য জেলা থেকে আসা ২১৬ জন রয়েছেন।
অপরদিকে অক্টোবরের ১ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ২ হাজার ৫২৫ জনের মধ্যে নগরীর ১ হাজার ৩১১ জন, ১৫টি উপজেলার ৯৭০ জন ও অন্যান্য জেলা থেকে আসা ২৪৪ জন রয়েছেন। উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায়। এই দশ মাসে (১ জানুয়ারি-৩০ অক্টোবর) উপজেলাটিতে ৯১২ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
তিন বোনের ডেঙ্গু যুদ্ধ, ফিরল দুজন
“বাবা, আমি হাল ছেড়ে দেব না, ফাইট করব”—আইসিইউর বিছানায় শুয়ে বাবাকে দেওয়া এই কথাটি শেষ পর্যন্ত রাখা হলো না নবম শ্রেণির ছাত্রী সাফিয়া হাসিন আরোশীর। ডেঙ্গুর সঙ্গে টানা লড়াই শেষে ২৫ অক্টোবর পৃথিবী ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছে এই কিশোরী।
ঢাকার একাডেমিয়ার মিরপুর ক্যাম্পাসের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরোশী ছাড়াও তার ছোট দুই বোন—ষষ্ঠ শ্রেণির সায়রা হাসিন সরোশী এবং প্রথম শ্রেণির সাকেরা হাসিন রোদশীও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। গত ১৯ অক্টোবর বড় বোন আরোশীর জ্বর দিয়ে এই কষ্টের শুরু। অবস্থার অবনতি হলে ২২ অক্টোবর তিন বোনকেই ধানমন্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে শারীরিক জটিলতা বাড়লে আরোশীকে বিআরবি হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়, যেখানে ২৫ অক্টোবর দুপুর ১টা ২৬ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
দাঁতের চিকিৎসক বাবা ডা. হাসানুজ্জামান ও শারমীন আক্তার দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল আরোশী। মাটিকাটার নিজস্ব ফ্ল্যাটে প্রথম জানাজা শেষে তাকে নোয়াখালীর মাইজদীতে দাদা-দাদির কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে। মেয়ের অকালপ্রয়াণে শোকে পাথর হয়ে যাওয়া বাবা বলেন, “হাসপাতালে যাওয়ার দিনও বলেছিলাম, আমরা পাঁচজনই বাসায় ফিরব। কিন্তু আমার ফাইটার মেয়েটা কথা রাখেনি, একজনকে ছাড়াই ফিরতে হলো।”
পুতুলের মতো মেয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে গেল
‘অনেক প্রার্থনা করেছি, মেয়েটা যেন সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু পুতুলের মতো মেয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। অনেক চেষ্টা করেছি। কোনোভাবেই মেয়েটাকে বাঁচাতে পারলাম না।’
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া আট বছরের শিশু ঐশী দাসের বিষয়ে জানাতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন শিশুটির চাচা মিটন দাস। গতকাল শুক্রবার সকালে নগরের উত্তর কাট্টলী বাংলাবাজার এলাকায় বাড়িতে কথা হয় তার সঙ্গে।
ঐশী দাসের মৃত্যু হয় গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। সে কাট্টলী এলাকার একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার বাবা লিটন দাস কুয়েতপ্রবাসী। ঐশী ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া আরেক মেয়ে রুহি দাসকে নিয়ে কাট্টলীর বাড়িটিতে থাকেন মা লিপি দাস।
গতকাল সকালে বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শোকের মাতম চলছে। ঘরের সামনে জড়ো হয়েছেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা। মেয়েকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তার মা লিপি দাস।
বাবা বিদেশ থেকে ফিরবেন, তাই ফ্রিজারে রাখা হয় ঐশীর মরদেহ। শুক্রবার সকালেই ফেরেন ঐশীর বাবা লিটন দাস। ঘরের সামনে এসেই তিনি মেয়ের মরদেহ দেখার জন্য আহাজারি করতে করতে ছুটে যান। এ সময় সেখানে উপস্থিত স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উত্তর কাট্টলী সনদ দত্ত মহাশ্মশানে ঐশীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
ঐশীর চাচা মিটন দাসের সঙ্গে বাড়িতে কথা হয়। তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে ঐশীর মৃত্যুতে তার বাবা, মা ও বোন সবাই ভেঙে পড়েছেন। তারা কেউই কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই। মেয়েটি পরিবারের সবার কাছে অনেক বেশি প্রিয় ছিল। তার এভাবে চলে যাওয়া কেউই মেনে নিতে পারছেন না।
বিশেষজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কেবল রুটিনমাফিক রাস্তাঘাট বা ড্রেন পরিষ্কার করা কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে ওষুধ ছিটানোই যথেষ্ট নয়। যেসব এলাকায় এডিস মশার ঘনত্বের সূচক বা ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ২০ বা তার বেশি রয়েছে, সেসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানকে চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তা না করা হলে কিউলেক্স মশা মরলেও এডিস মশার বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে না।
এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা না হলে এই পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই কেবল লোক দেখানো পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, বরং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক ও কার্যকর কৌশল নিয়ে এখনই মাঠে নামার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হওয়ার এবং জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কেকে/সাশ