কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলাই ইউনিয়নের গোয়ালাপাড়া গ্রামের মেঘনা বিলে ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি এবং মাছ চাষের জন্য দীর্ঘ মাটির বাঁধ নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এতে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রস্তাবিত বাঁধ নির্মাণ করা হলে মেঘনা বিলসহ আশপাশের পাঁচটি বিলের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষিজমি ও বসতবাড়ি রক্ষায় দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, আগেও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনসংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হলেও সম্প্রতি আবারও মাটি কাটা ও মাছের ঘের তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার বৌলাই ও যশোদল ইউনিয়নের দক্ষিণ ভরাটি ও গোয়ালাপাড়া গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মেঘনা বিলের অবস্থান। বিলের ফসলি জমির ওপর নির্ভরশীল এলাকার অসংখ্য কৃষক ও দিনমজুর। বংশপরম্পরায় এসব জমিতে আমন-বোরো ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, গোয়ালাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. সাদ্দাম হোসেন নিজের জমির পাশাপাশি অন্যের জমি লিজ নিয়ে মাছ চাষের জন্য ঘের তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। এ উদ্দেশ্যে ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘেরের চারপাশে দীর্ঘ মাটির বাঁধ নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। মেঘনা বিল কেবল কৃষিকাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি আশপাশের এলাকার পানি নিষ্কাশনেরও অন্যতম পথ। এ বিলের সঙ্গে দাসপট্টিল, ছাইহাই, মাগুরয়া ও দারিচুরা বিলের পানির সংযোগ রয়েছে। আশপাশের এসব বিলের পানি মেঘনা বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নিষ্কাশিত হয়। ফলে এখানে দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করে পানিপ্রবাহ সংকুচিত বা বন্ধ করা হলে পাঁচটি বিলের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। এতে আমন ও বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষক নাফিউল হাসান বলেন, মেঘনা বিলের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ১০০ একর জমিতে এলাকার মানুষ কৃষিকাজ করেন। কারও নিজের জমি রয়েছে, আবার অনেকে দিনমজুর হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালান। কিন্তু সাদ্দাম হোসেন নিজের জমির পাশাপাশি অন্যের জমি লিজ নিয়ে মাছের ঘের করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ জন্য মাটি বিক্রি ও বাঁধ নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এর আগেও বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়রা আপত্তি জানিয়েছিলেন। তখন বর্ষা মৌসুমে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল। এখন শুকনো মৌসুমে আবারও মাটি কাটার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কার্যক্রম বন্ধ রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।’
নাফিউল হাসানের দাবি, মেঘনা বিল দিয়ে কিশোরগঞ্জ পৌরসভাসহ সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পানি নিষ্কাশিত হয়। এখানে বাঁধ নির্মাণ করা হলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের বাড়িঘর ও ফসলি জমিতে পানি জমে যেতে পারে।
কৃষক মোহাম্মদ রাসেল বলেন, এখানে মাছের ঘের করা হলে আশপাশের কৃষিজমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিছুদিন আগে বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় স্থানীয়রা নিজেরাই কোদাল দিয়ে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর কোনো রকমে ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এখন আবার বাঁধ নির্মাণ করে মাছের ঘের করা হলে কৃষকদের ফসল ফলানোর সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসবে। আশপাশের বিভিন্ন জমি ও এলাকার পানি চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। বাঁধ নির্মাণ হলে পানি আটকে গিয়ে বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কৃষিজমি ও বসতবাড়ি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কৃষক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, তাদের বাপ-দাদারা দীর্ঘদিন ধরে এসব জমিতে চাষাবাদ করে আসছেন। তারাও সেই ধারাবাহিকতায় কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু এখন জমিগুলোতে মাছের ঘের করার উদ্যোগ নেওয়ায় তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
তিনি বলেন, মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হলে বাঁধের উজানে থাকা জমিগুলোতে পানি আটকে থাকবে। এতে ধানসহ বিভিন্ন ফসল পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। গত বছরও বৃষ্টির পানিতে অনেক জমির ধান নষ্ট হয়েছে। নতুন করে বাঁধ নির্মাণ করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। কৃষিজমি রক্ষা করা না গেলে এলাকার কৃষকরা জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
কৃষক সিরাজ মিয়া বলেন, তাদের পরিবার বংশপরম্পরায় আমন ও বোরো ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তাঁর নিজেরও ৩০ শতাংশ জমি রয়েছে। এসব জমিতে মাছের ঘের করা হলে তাঁদের মতো কৃষকদের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে গেলে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। এ সময় কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আলাল হোসেন বলেন, ‘মেঘনা বিল শুধু আমাদের গ্রামের নয়, আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষের কৃষিকাজ ও পানি নিষ্কাশনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিলের ওপর দিয়ে আশপাশের কয়েকটি বিলের পানি চলাচল করে। এখানে মাটির বাঁধ নির্মাণ করে মাছের ঘের করা হলে পানি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে না। বর্ষা মৌসুমে পানি আটকে গিয়ে ফসলি জমি ও বাড়িঘরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ কৃষকরা। আমরা চাই, প্রশাসন দ্রুত বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে কৃষিজমি ও এলাকার মানুষের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিক।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, “আমি ফিশারি করছি। এ জন্য কার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে কেন অনুমতি নেব? যাঁর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন, তাঁর কাছ থেকেই অনুমতি নিয়েছি। আর কৃষকরা অভিযোগ করলেই কি আপনাদের দৌড়ে চলে আসতে হবে?” এ কথা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুল হাসান মারুফ বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, গত ৫ জুলাই এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগের পর ইউএনওর মাধ্যমে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনসংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। তবে সেই স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে আবারও মাটি খনন ও মাছের ঘের তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
কেকে/সাশ