ইসলামী মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে কিশোরগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়েছে ইউনাইটেড কেয়ার স্কুল অ্যান্ড হোমসের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী, কোরআনের সবক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মাত্র ১০ মাসে প্রতিষ্ঠানটির হিফজ বিভাগে ৪৯ জন শিক্ষার্থীকে কোরআনের সবক প্রদান অনুষ্ঠানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১০টায় কিশোরগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক আজিজ আহমেদ হুমায়ুন। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ, আজিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোকাব্বেরম হোসেন শোকরানা। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আব্দুল কাদির জুয়েল।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শিক্ষার্থীদের কোরআনের সবক প্রদান করা হয়। পরে বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল, সিরাত, স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। পরে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।
অনুষ্ঠানে অভিভাবক নূরুন নাহার বলেন, তার দুই সন্তান এ প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে এবং ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। তার মেয়ে অ্যাকাডেমিক পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে প্রথম স্থান অর্জন করছে। পাশাপাশি সিরাত ও বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার স্মৃতিশক্তি পরীক্ষাতেও প্রথম হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থা রেখেই সন্তানদের এখানে ভর্তি করিয়েছি। শিক্ষকদের আন্তরিকতা, শিক্ষার্থীদের প্রতি যত্ন এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আমাদের মুগ্ধ করেছে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের পাশাপাশি আরবি শিক্ষার সমন্বয়ও ভালো লেগেছে। একজন অভিভাবক হিসেবে আমরা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমে সন্তুষ্ট।’
প্লে শ্রেণির শিক্ষার্থী জাহরান আরিফের অভিভাবক মোহাম্মদ আবু সায়েম বলেন, ছেলের বয়স চার বছর থাকতেই তাকে এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান। এক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সে সাফল্য অর্জন করেছে। সম্প্রতি সিট-টু প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষকেরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদাভাবে নজর দেন। যারা পড়াশোনায় কিছুটা দুর্বল, তাদের হাতে-কলমে শেখানোর চেষ্টা করেন। এমনকি শিক্ষার্থীরা বাসায় যাওয়ার পরও শিক্ষকরা ফোন করে পড়া বুঝেছে কি না, তা খোঁজ নেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের এমন দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতা আমাদের ভালো লেগেছে।’
প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যাম্পাস ইনচার্জ ও সহকারী শিক্ষক তাহমিনা আক্তার মনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখাতে সপ্তাহে এক দিন বিভিন্ন শিক্ষামূলক খেলার মাধ্যমে বিশেষ ক্লাস নেওয়া হয়। পাশাপাশি সপ্তাহে দুই দিন মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রতিদিন স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা ও পূর্ববর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান পদ্ধতি বিবেচনায় নিয়ে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আগামী বছর থেকে আরও পরিকল্পিতভাবে স্পোকেন ইংলিশ, মাল্টিমিডিয়া ও বিশেষ শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মাসুদুর রহমান বলেন, ঢাকায় প্রায় ২০ বছর স্কুল পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে চলতি বছর কিশোরগঞ্জে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু করেন তারা। শুরু থেকেই ইসলামী মূল্যবোধ ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষার্থী গড়ে তোলাকে মূল লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর। শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, আদব-কায়দা ও মানবিক গুণাবলি তৈরি করাও জরুরি। আমাদের লক্ষ্য, একজন শিক্ষার্থী কোরআন-হাদিসের শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ডাক্তার, প্রকৌশলী কিংবা অন্য যেকোনো পেশায় যাওয়ার সুযোগ পাবে।’
ড. মাসুদুর রহমান আরও বলেন, অনেক অভিভাবক সন্তানদের ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে কোনটি বেছে নেবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। সেই জায়গা থেকেই দুই ধারার শিক্ষার সমন্বয় ঘটানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। প্রতিষ্ঠানে হিফজ বিভাগ রয়েছে। মাত্র ১০ মাসের মধ্যে ৪৯ জন শিক্ষার্থীকে কোরআনের সবক প্রদান করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, প্রথম বছরেই তিন শতাধিক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে দুটি ক্যাম্পাসে শিক্ষাকার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া গুরুদয়াল সরকারি কলেজের পেছনে নিরালা গলিতে হারুয়া এলাকায় নতুন আরেকটি ক্যাম্পাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ক্যাম্পাসে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে উকিলপাড়া ক্যাম্পাসে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি এবং নির্ঝর রোড ক্যাম্পাসে পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির কার্যক্রম চলছে।
কেকে/এআই