রোববার, ১ নভেম্বর ২০২৬,
১৭ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● আবারও মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সড়ক অবরোধ      ● জাতীয় অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি যুবসমাজ : প্রধানমন্ত্রী      ● ফ্যাসিবাদ রুখতে রাজনৈতিক ঐক্যের বিকল্প নেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● কোনাবাড়ী থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত সব পোশাক কারখানা ছুটির ঘোষণা      ● রাজশাহী বোর্ডে এইচএসসিতে ফলাফল বিপর্যয়      ● হাম উপসর্গে আরও একজনের মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১২৫২      ● এইচএসসিতে পাসের হারে শীর্ষে ঢাকা, তলানিতে বরিশাল      
দেশজুড়ে
সিডরের স্মৃতি থেকে COP31, উপকূলের কণ্ঠ বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে চান বরগুনার মুন্না
খান নাঈম, বরগুনা
প্রকাশ: রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:০২ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

নিজস্ব উদ্যোগে তৃণমূলের তরুণদের সংগঠিত করা থেকে জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু নেতৃত্ব প্রায় সাত বছরের পথচলায় খাইরুল ইসলাম মুন্নার লক্ষ্য এখন বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের সংকট ও দাবি আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা। নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন COP31-এ অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নে জন্ম মো. খায়রুল ইসলাম মুন্নার। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় তিনি ছিলেন শিশু। সেই দুর্যোগে তার পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। উপকূলের মানুষের জীবনে দুর্যোগের প্রভাব, অনিশ্চয়তা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম তার কাছে তাই কেবল দূর থেকে দেখা কোনো বাস্তবতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজের পরিবারের অভিজ্ঞতাও।

শৈশবের সেই অভিজ্ঞতা আর উপকূলের মানুষের জীবনসংগ্রাম তাকে ধীরে ধীরে ভাবিয়েছে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো নিয়ে। কেন উপকূলের মানুষ বারবার দুর্যোগের ক্ষতির মুখে পড়েন? কেন তাদের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ জরুরি? আর তাদের অভিজ্ঞতা ও দাবিগুলো জাতীয় পর্যায়ে কতটা গুরুত্ব পায়?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হন মুন্না। তার পথচলা সহজ ছিল না। উপকূলের একটি উপজেলা থেকে কাজ শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে নিজের পরিচয় তৈরি করা, তরুণদের সংগঠিত করা এবং জলবায়ু নিয়ে কাজের সুযোগ তৈরি করতে তাকে ধাপে ধাপে এগোতে হয়েছে। প্রায় সাত বছরের এই প্রচেষ্টায় তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের কাজের পরিসর ও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা।

এবার সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন COP31-এ অংশ নিতে যাচ্ছেন তিনি। তার লক্ষ্য, বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের বাস্তবতা, জলবায়ু অভিযোজনের চাহিদা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরা।

মুন্নার বাবা মো সিদ্দিকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী। মা খাদিজা আক্তার বেবী গৃহিণী। তার ছোট ভাই আরিফুল ইসলাম মান্না একজন শিক্ষার্থী। তিনিও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন।

পরিবারের অভিজ্ঞতা, নিজের বেড়ে ওঠা এবং উপকূলের মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ মুন্নার কাজের ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, উপকূলের সংকটকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে মানুষের জীবিকা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।

উপকূলের মানুষের এসব অভিজ্ঞতা বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার তাগিদ থেকেই তার কাজের পরিধি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মধ্য দিয়ে মুন্নার পথচলা শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সংগঠিত উদ্যোগ ও দক্ষ তরুণ নেতৃত্ব। সেই ভাবনা থেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গ্রিন পিস ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (GPYDS)। বর্তমানে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

GPYDS-এর কাজের কেন্দ্রে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা, যুব নেতৃত্বের বিকাশ এবং শিশু, কিশোরী ও নারীদের অধিকার। বরগুনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও ঢাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এক হাজারের বেশি তরুণ স্বেচ্ছাসেবক।

তরুণদের সংগঠিত করা, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সমস্যার সমাধানে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয় সংগঠনটি। জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক কাজের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, কিশোরী ও নারীদের স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সামাজিক উন্নয়নেও উদ্যোগ রয়েছে তাদের।

একটি উপকূলীয় এলাকা থেকে সংগঠন গড়ে তোলা এবং সেটিকে পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা মুন্নাকে শিখিয়েছে, শুধু আগ্রহ থাকলেই কাজ এগিয়ে নেওয়া যায় না। প্রয়োজন মানুষের আস্থা অর্জন, দল গঠন, পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

তার কাছে GPYDS শুধু একটি সংগঠন নয়; উপকূলের তরুণদের নিজেদের এলাকার সমস্যা নিয়ে কাজ করার এবং নেতৃত্ব দেওয়ার একটি সুযোগ।

উপকূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু নেতৃত্ব

তৃণমূলের অভিজ্ঞতাকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করাই এখন মুন্নার কাজের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, উপকূলের মানুষ প্রতিদিন যে সংকটের মুখোমুখি হন, তার অনেক কিছুই নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যথেষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না।

এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি বিভিন্ন যুব ও জলবায়ুবিষয়ক উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। ২০২৬ সালে তিনি LCOY Bangladesh-এর যোগাযোগ ও গণমাধ্যমবিষয়ক নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ বরিশাল বিভাগের সভাপতি এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ইয়ুথ অ্যাডভাইজরি প্যানেলের সদস্য এবং কান্ট্রি ম্যানেজমেন্ট টিমে যুব প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এসব অভিজ্ঞতা তাকে তরুণদের মতামত, যোগাযোগ এবং জলবায়ুবিষয়ক আলোচনার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়নের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি জলবায়ু সংকটের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরার বিষয়েও আগ্রহী।

তাঁর কাছে জলবায়ু নেতৃত্বের অর্থ শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়া নয়। বরং স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা, তাঁদের দাবি তুলে ধরা এবং সেই দাবির সঙ্গে নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার সংযোগ তৈরি করাও এর অংশ।

COP31-এ উপকূলের কথা তুলে ধরার প্রস্তুতি

২০২৬ সালের নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন COP31-এ অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মুন্না। বরগুনা জেলা থেকে এই প্রথম তরুণ জলবায়ু কর্মী হিসাবে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তার জন্য উপকূলের মানুষের অভিজ্ঞতা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

ইতিমধ্যে তিনি সম্মেলনের অফিসিয়াল  ব্যাজ ও তুরস্কের ভিসা পেয়েছেন। তার ফ্লাইট নির্ধারিত রয়েছে ২ নভেম্বর। ৮ নভেম্বর থেকে সম্মেলনকেন্দ্রিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

COP31-এ তার বিশেষ আগ্রহ থাকবে জলবায়ু অভিযোজন (Adaptation) এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা (Loss and Damage) বিষয়ে। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি, স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজনের বাস্তবতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা অনুসরণ করতে চান তিনি।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার চাহিদা ও অভিজ্ঞতা জাতীয় পর্যায়ের জলবায়ু আলোচনায় তুলে ধরার এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে তার। গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেও উপকূলের মানুষের জীবন, সংকট ও সম্ভাবনার গল্প আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে চান তিনি।

মুন্নার কাছে এই অংশগ্রহণের গুরুত্ব শুধু সম্মেলনে উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান, উপকূলীয় মানুষের বাস্তবতা নিয়ে যে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি তার তৈরি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হোক। পাশাপাশি সেখান থেকে অর্জিত জ্ঞান ও যোগাযোগ বাংলাদেশের তরুণদের জলবায়ু কার্যক্রমে কাজে লাগানো সম্ভব হোক।

মুন্নার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সংকট ও দাবি বিভিন্ন পর্যায়ে তুলে ধরা। স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের অভিজ্ঞতা ও চাহিদা চিহ্নিত করে সেগুলোকে জেলা, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আলোচনা ও অ্যাডভোকেসির সঙ্গে যুক্ত করতে চান তিনি।

এ জন্য GPYDS-এর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা, তরুণদের জলবায়ুবিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধি, গণমাধ্যম ও যোগাযোগের ব্যবহার বাড়ানো এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

তার লক্ষ্য, উপকূলের মানুষের কথা যেন কেবল দুর্যোগের পর সংবাদ শিরোনামে সীমাবদ্ধ না থাকে। তাদের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও অধিকার যেন জলবায়ু পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোচনায়ও গুরুত্ব পায়।

বরগুনার বেতাগী থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রায় সামনে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে মুন্নার কাজের মূল প্রেরণা একই যে উপকূল তাকে বাস্তবতা চিনিয়েছে, সেই উপকূলের মানুষের অভিজ্ঞতা ও দাবি আরও দূর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া। COP31 তার সেই প্রচেষ্টার একটি নতুন অধ্যায় হতে যাচ্ছে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  সিডর   উপকূল  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close