চোখে আলো নেই, কিন্তু রয়েছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর তীব্র আত্মবিশ্বাস। সব আঁধার জয় করে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন মৌলভীবাজারের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী তাহমিনা আক্তার মৌমি।
চলতি বছর সিলেট শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সার্বিক বিপর্যয় ঘটলেও, তার মাঝে ব্যতিক্রমী ও উজ্জ্বল এক নক্ষত্র হয়ে উদ্ভাসিত হয়েছেন মৌমি। তিনি সিলেট সরকারি মদন মোহন কলেজের মানবিক বিভাগের ছাত্রী। নিজের মেধা, কঠোর অধ্যবসায় ও পরিবারের অনুপ্রেরণায় তিনি এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন।
তাহমিনা মৌমি মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর গ্রামের আব্দুল আহাদ ও আমিনা আক্তার পুষ্প দম্পতির কন্যা। ছোটবেলা থেকেই তিনি সিলেটে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের আবাসন ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করা স্বনামধন্য সংস্থা ‘গ্রীন ডিসএ্যাবল্ড ফাউন্ডেশনের (জিডিএফ) সঙ্গে যুক্ত। সংস্থাটির আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে শিশু শ্রেণি থেকেই তার শিক্ষার পথচলা শুরু হয়। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় মৌমির শ্রুতিলেখক (রাইটার) হিসেবে সহযোগিতা করেছেন হাজী আব্দুস সাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পল্লব রায়।
সাফল্যের পিছনের সংগ্রামর কথা জানাতে গিয়ে তাহমিনা আক্তার মৌমি বলেন, ‘মাঝখানে আমার পরীক্ষা নিয়ে একটা জটিলতা দেখা দিয়েছিল। বোর্ড থেকে পারমিশন না দেওয়ায় এ বছর পরীক্ষা দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সকলে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। সবার সাহায্য-সহযোগিতায় আমি পরীক্ষা দিয়ে আজ একটি ভালো ফলাফল অর্জন করতে পেরেছি। ফ্যামিলির সবাই ও প্রতিষ্ঠানের সবাই আমার ফলাফলের জন্য অনেক খুশি।’
ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা জানিয়ে মৌমি আরও বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন একজন ব্যাংকার হওয়া। পাশাপাশি সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং দেশের মানুষের সেবা করা। এখন ভার্সিটি অ্যাডমিশনের জন্য প্রস্তুতি নেব, ইচ্ছা আছে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। আমার এই ফলাফলের পেছনে আমার শিক্ষকদের বড় অবদান রয়েছে, উনারা দুই বছর আমাকে ভালোভাবে গাইডলাইন দিয়েছেন। সেই সাথে জিডিএফ-এর সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
মৌমির এই অসামান্য অর্জনে আনন্দিত পুরো জিডিএফ পরিবার। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক বায়েজিদ আহমদ খান বলেন, ‘মৌমি শিশু শ্রেণি থেকেই আমাদের এখানে আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে পড়ালেখা করছে। সিলেট বোর্ডে সার্বিক ফল বিপর্যয়ের মাঝেও তার এই কৃতিত্বপূর্ণ সাফল্য আমাদের অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত করেছে।’
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মৌমিকে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘গ্রীন ডিসএ্যাবল্ড ফাউন্ডেশন আবাসিক ও অনাবাসিক ব্যবস্থায় শিশু শ্রেণি থেকে গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি যদি স্থায়ীকরণ হয় বা একটি সুন্দর ভবন তৈরি করা যায়, তবে আমরা সিলেটে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষদের জন্য আরও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারব। এ ক্ষেত্রে সরকারসহ সকলের সহযোগিতা কামনা করছি। প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর সঠিক সুযোগ পেলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা প্রতিকূলতা যে সাফল্য অর্জনে কোনো বাধা হতে পারে না–তাহমিনা আক্তার মৌমির এই অর্জন যেন সেটাই আবার প্রমাণ করল।’
কেকে/এআই