হেমন্তের সোনাঝরা রোদে এখন মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে যেন সোনালি ধানের হাতছানি। অনুকূল আবহাওয়া, সরকারের সময়োপযোগী সহায়তা এবং কৃষকদের নিরলস পরিশ্রমে জেলায় আগাম আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।
পাকা ধানের গন্ধে মুখরিত চারপাশ। মাঠের পর মাঠ কম্বাইন হারভেস্টারের গর্জন আর কৃষকদের কাস্তে হাতে ধান কাটায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে বাম্পার ফলনের এই আনন্দের মাঝেও কৃষকের মনে ভর করেছে গভীর উৎকণ্ঠা—উৎপাদন খরচ কি উঠবে? ধানের ন্যায্যমূল্য কি মিলবে বাজারে?
বাম্পার ফলনে সোনালি হাসির ঝিলিক :
চলতি মৌসুমে মৌলভীবাজার জেলায় ৯৯ হাজার ১৫৪ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব জমি থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৯৬ মেট্রিক টন।
সরেজমিনে জেলার খাইঞ্জার হাওড়পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, সোনালি ধানের শীষে ভরে আছে পুরো প্রান্তর। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কম্বাইন হারভেস্টারের সাহায্যে দ্রুত ধান কাটা ও মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। সরকার নির্ধারিত সময়ে বিনামূল্যে সার ও বীজ বিতরণ এবং কৃষি বিভাগের নিয়মিত তদারকি ও উদ্বুদ্ধকরণেই মূলত এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আমনের সফল চাষাবাদ সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মুখে হাসি, মনে শঙ্কা :
ফলন ভালো হলেও উৎপাদন খরচ ও বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই কৃষকদের। মোস্তফাপুর ইউনিয়নের কৃষক শিমুল এ বছর ৯ কিয়ার জমিতে আমন আবাদ করেছেন। ফলন আশানুরূপ হলেও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, গতবারের তুলনায় এবার বীজ, সার, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুরই দাম বহুগুণ বেড়েছে।
একই ইউনিয়নের আরেক কৃষক এসএম উমেদ আলী বলেন, ‘খুব যত্নে হাইব্রিড জাতের আমন চাষ করেছি এবং ফলনও দারুণ হয়েছে। কিন্তু ধান বাজারে তোলার সময় যদি উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম কম পাই, তবে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে।’
কৃষক সৈয়দ হুমায়েদ আলী শাহীনসহ অনেকেরই সুর একই—ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে এই বাম্পার ফলনের আনন্দ ফিকে হয়ে যাবে।
প্রশাসনের আশ্বাসে ভরসা খুঁজছেন কৃষকরা :
কৃষকদের এই উদ্বেগের কথা মাথায় রেখে মাঠে নেমেছেন জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। সম্প্রতি মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে কৃষকদের ধান কাটতে উৎসাহিত করেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন।
মো. জালাল উদ্দিন জানান, প্রাকৃতিক কোনো বড় দুর্যোগ না হওয়া, অনুকূল আবহাওয়া এবং সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তার ফলেই এবার আমনের এমন বাম্পার ফলন পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
কৃষকদের লোকসান থেকে বাঁচাতে ও ধানের সঠিক মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল। তিনি বলেন, ‘আমাদের কৃষকরা যেন কোনোভাবেই উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি ও সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।’
কেকে/এআই