সিলেটের বিয়ানীবাজারে সাদিকুল ইসলাম রূপকের (২৭) অস্বাভাবিক মৃত্যুর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো জানা যায়নি তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। নিজ বাড়ির ড্রয়িংরুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধারের সময় দুই হাত পেছনে বাঁধা ছিল বলে দাবি পরিবারের। ঘটনাটি হত্যা, নাকি আত্মহত্যা—এ নিয়ে শুরু থেকেই তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। থানা পুলিশের পর মামলার তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে গেলেও এখনো মেলেনি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির খবর। ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা প্রতিবেদন না পাওয়ায় তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও উদ্বিগ্ন স্বজনরা।
গত ৩১ মে বিয়ানীবাজার পৌরসভার খাসাড়িপাড়া গ্রামে নিজ বাড়ির ড্রয়িংরুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় রূপকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের ভাষ্য, মরদেহের দুই হাত পেছনে বাঁধা ছিল। এ অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক মনে হয়নি স্বজনদের কাছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ঈদুল আজহার পরদিন রূপকের মা, স্ত্রী, বোন ও দুই শিশু সন্তান নানাবাড়ি কোনাগ্রামে বেড়াতে যান। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যাওয়ার কথা থাকলেও রূপক বাড়িতেই থেকে যান। পরদিন ৩১ মে বিকেলে তাঁরা বাড়িতে ফিরে তাঁর কোনো সাড়া না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ড্রয়িংরুমে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
ঘটনাস্থল থেকে রূপকের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন ও চিরকুট উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চিরকুটে কয়েকজনের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের হিসাব লেখা ছিল। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরদিন জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই কয়েকটি বিষয় ঘিরে সন্দেহ তৈরি হয় স্বজনদের মধ্যে। দুই হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় কীভাবে তাঁর মরদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিল, মৃত্যুর আগে কারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণে কী পাওয়া গেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। চিরকুটে উল্লেখ করা আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
রূপকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটনের দাবিতে স্থানীয়রা বিক্ষোভ ও থানা ঘেরাও কর্মসূচিও পালন করেন। একপর্যায়ে নিহতের মা রাবিয়া বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে বিয়ানীবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি ৬ নম্বর হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
প্রথমে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করে। পরে তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআইকে। গত ২ আগস্ট সিলেট পিবিআই তদন্ত শুরু করে। তবে নতুন তদন্ত সংস্থা দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা প্রতিবেদন হাতে পাননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব প্রতিবেদন না পাওয়ায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং তদন্তের পরবর্তী ধাপ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রূপকের পরিচিতজন ও আড্ডার সঙ্গীদের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখনো কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা যায়নি।
ভাইয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বড় ভাই জহুরুল ইসলাম ইপক। তিনি বলেন, ‘আপন-পর বুঝি না। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন দেখতে চাই।’
নিহতের মা ও মামলার বাদী রাবিয়া বেগম বলেন, ‘আমার পুয়ারে (ছেলেকে) মারা অইছে। বাড়িতে সুস্থ-স্বাভাবিক ছেলেকে রেখে গিয়েছিলাম, ফিরে তার মরা লাশ দেখলাম। আমি কিভাবে মানিয়া নিতাম? আমি তার হত্যাকারীদের পরিচয় জানতে চাই এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’
এ বিষয়ে পিবিআই সিলেটের উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ বলেন, ‘গুরুত্বসহকারে তদন্ত চলছে। তবে এখনো আশানুরূপ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভিসেরা ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’
রূপকের মৃত্যুর পর বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছে তার দুই শিশু সন্তান ওয়াসিয়া ইসলাম (৫) ও ওয়াজিয়া ইসলাম (১)। স্বামীকে হারিয়ে শোকের মধ্যে দিন কাটছে স্ত্রীরও। পরিবারের সদস্যদের অপেক্ষা এখন একটাই—তদন্ত শেষ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ প্রকাশ করা হোক এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
কেকে/সাশ