জন্ম থেকেই দুটি হাত নেই। তবে সেই শারীরিক সীমাবদ্ধতা থামাতে পারেনি তার এগিয়ে চলা। পা দিয়ে লিখেই একের পর এক শিক্ষার ধাপ পেরিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন জয়পুরহাটের ক্ষেতলালের বিউটি খাতুন। এবার তার লক্ষ্য বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হওয়া।
বিউটি খাতুন ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের বাসিন্দা। দরিদ্র কৃষক বায়েজিদ হোসেন ও রহিমা খাতুন দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে তিনি ছোট। জন্মের পর মেয়ের দুটি হাত না থাকার বিষয়টি পরিবারকে দুশ্চিন্তায় ফেললেও বিউটি নিজেই ধীরে ধীরে নিজের পথ তৈরি করেন। ছোটবেলা থেকে পা দিয়ে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন। একসময় পা-ই হয়ে ওঠে তার পড়াশোনার প্রধান অবলম্বন।
প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনায় ভালো ফল ধরে রাখেন বিউটি। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার পাশাপাশি বৃত্তিও অর্জন করেন। ২০১৭ সালে আখলাশ শিবপুর শ্যামপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পান। ২০১৯ সালে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করেন।
এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। দীর্ঘ অধ্যবসায়ের পর ২০২৬ সালের অক্টোবরে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
শুধু লেখাপড়াই নয়, দৈনন্দিন কাজও পা দিয়ে সামলান বিউটি। শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও শিক্ষানুরাগীদের সহযোগিতা পেয়েছেন। তবে কারও করুণার ওপর নির্ভর না করে নিজের যোগ্যতায় আত্মনির্ভরশীল হতে চান তিনি।
বিউটি খাতুন বলেন, শৈশব থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি মানুষের কটু কথাও শুনতে হয়েছে তাকে। তবে সেসব কথায় ভেঙে না পড়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এখন বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চান।
বিউটির বাবা বায়েজিদ হোসেন বলেন, মেয়ের জন্মের পর তার পড়াশোনা ও নিজের কাজ নিজে করতে পারা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। সে লেখাপড়া করতে পারবে, এমনটা ভাবেননি। মেয়ের বর্তমান অর্জনে তাঁরা গর্বিত।
আখলাশ শিবপুর শ্যামপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক একরামুল ইসলাম উজ্জ্বল বলেন, বিউটির সাফল্য শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার। ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে শারীরিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে এখন নতুন লক্ষ্যের পথে বিউটি। বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারকের আসনে বসার স্বপ্ন তাঁর। নিজের জীবনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে এবার মানুষের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে চান তিনি।
কেকে/সাশ