শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬,
২৩ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনাই হোক আগামীর প্রেরণা: প্রধানমন্ত্রী      ● দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির      ● ৭ নভেম্বর দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা      ● সীমান্তের ওপার থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী      ● মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ● হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ইকবাল সোবহান, মুচলেকায় মুক্ত রাজীব ঘোষ      ● শ্রমিকদের ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী অপচেষ্টা চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সুশাসন জরুরি
মো. নূর হামজা পিয়াস
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১:৩২ পিএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সংগৃহীত রাজস্ব আয়। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মন্থরতা, বেসরকারি বিনিয়োগে তীব্র মন্দা এবং সরকারি ব্যয়ের শ্লথগতির কারণে সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। যার ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এনবিআর প্রায় ৪৩,০০০ কোটি টাকার এক বিশাল ও নজিরবিহীন রাজস্ব ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক বাজেট বাস্তবায়নে এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে শিল্প উৎপাদন, সাপ্লাই চেইন এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট এবং উচ্চ সুদহারের কারণে নতুন কোনো বড় বিনিয়োগ বা শিল্পায়ন হচ্ছে না। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে এই স্থবিরতা প্রত্যক্ষভাবে সরকারের কর আদায়ের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য ব্যয় নির্বাহের জন্য যখন অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করার কথা, ঠিক সেই সময়ে রাজস্ব আয়ে এমন বড় ধরনের পতন অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলে দিচ্ছে।

শিল্প উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা বিক্রয় এবং ভোক্তা চাহিদার একটি প্রধান ও নির্ভরযোগ্য সূচক হলো মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট। এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ভ্যাট সংগ্রহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে বরং ১৬ শতাংশের এক তীব্র ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। বাজারে পণ্যের বিক্রি কমে যাওয়া এবং উৎপাদনমুখী কারখানাগুলোতে উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণে ভ্যাট বা পরোক্ষ কর আদায় আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের ভঙ্গুর অবস্থাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

জাতীয় রাজস্ব আয়ের অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো বেসরকারি খাতের শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক বিস্তার। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাব এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ থেকে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন। কারখানাগুলো তাদের পূর্ণ ক্ষমতার অর্ধেক বা তার চেয়ে কম উৎপাদনে চলতে বাধ্য হচ্ছে। শিল্প খাতে এই গভীর মন্দা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার কারণে একদিকে যেমন বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে করজাল বা ট্যাক্স বেসও সংকুচিত হয়ে আসছে।

রাজস্ব ঘাটতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও পরিচালন ব্যয়ের ওপর। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আদায় না হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড় সীমিত করে দিচ্ছে। এর ফলে দেশের মেগা অবকাঠামো থেকে শুরু করে সাধারণ উন্নয়নমূলক কাজগুলোর গতি মারাত্মকভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে। সরকারি ব্যয় হ্রাসের ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বা লিকুইডিটি কমে গেছে, যা নির্মাণ খাত ও সহযোগী শিল্পগুলোকে এক গভীর মন্দার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক মন্দা ও ভ্যাট হ্রাসের ক্রমাগত প্রভাবে বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৪৩,০০০ কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। কর ও ভ্যাট আদায়ের এই বিশাল ব্যবধান পূরণ করতে সরকারকে এখন ব্যাংক ঋণ কিংবা বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে এভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তা দেশের বেসরকারি খাতের জন্য নির্ধারিত ঋণের প্রবাহকে সংকুচিত করে দেয়, যাকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট এফেক্ট’ বলা হয়।

আমদানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং এলসি খোলার জটিলতার কারণে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় কাস্টমস শুল্ক ও সুনির্দিষ্ট আমদানি কর বাবদ সরকারের কোষাগারে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণও অনেক কমে গেছে। রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকায় এবং আমদানি শুল্ক বাবদ আয় হ্রাস পাওয়ায় সরকারের বৈদেশিক বাণিজ্যের হিসাব এবং সামগ্রিক রাজস্ব ভারসাম্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

দেশের অর্থনীতিতে এখনো একটি বিশাল অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক বা ইনফর্মাল ইকোনমি হিসেবে রয়ে গেছে, যা কর জালের বাইরে অবস্থান করছে। বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট খাতের একটি অংশ নানামুখী কৌশলে কর ফাঁকি দিয়ে আসছে। এনবিআরের মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও অডিট ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এই কর ফাঁকি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ সঠিক উপায়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় আনা গেলে এবং ফাঁকি রোধ করা গেলে বর্তমান রাজস্ব ঘাটতির বিরাট অংশ সহজেই পুষিয়ে নেওয়া যেত।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভেতরের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ফাইল চালাচালির দীর্ঘসূত্রতা এবং করদাতাদের হয়রানির সংস্কৃতি রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধিকে সবসময় বাধাগ্রস্ত করেছে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কর প্রশাসনকে শতভাগ অটোমেটেড ও পেপারলেস করে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত ধীরগতির। করদাতারা রিটার্ন দাখিল ও ভ্যাট পরিশোধের ক্ষেত্রে আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পূর্ণ সুবিধা না পাওয়ায় কর প্রদানে অনীহা প্রকাশ করেন, যা সরাসরি রাজস্ব সংগ্রহকে নিম্নমুখী করে তোলে।

বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। নিত্যপণ্য ক্রয় করতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের সঞ্চয় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় বাজারে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বা কনজুমার ডিমান্ড মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ায় খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসার পরিধি গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সরকারের ভ্যাট ও কর সংগ্রহের ওপর।

দেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং আস্থার অভাবে ধুঁকছে। অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের নিজেদের তারল্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সরকারের ট্রেজারি বিল বা বন্ডে বিনিয়োগ কিংবা কর জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে হিসাব ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ব্যাংক খাতের ভেতরের এই অস্থিতিশীলতা ব্যবসা বাণিজ্যের লেনদেনকে শ্লথ করে দিয়েছে এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর পরিশোধের সক্ষমতাকে সাময়িকভাবে স্থবির করে রেখেছে।

এনবিআরের সংগ্রহশালায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে করদাতাদের আয় এবং ব্যয়ের অসঙ্গতি খুব সহজেই ধরা সম্ভব। ভ্যাট ও ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার আধুনিক কৌশলগুলো প্রতিহত করতে অটোমেটেড ই-টিডিএস (e-TDS)  এবং রিয়েল-টাইম ভ্যাট মনিটরিং সিস্টেম চালু করতে হবে। প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব চুরির পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে এবং সরকারি কোষাগারে রাজস্ব প্রবাহ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।

দেশের অর্থনীতির আসল মেরুদণ্ড হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাত। এই খাতগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও কর্মসংস্থান সচল রাখা সম্ভব নয়। রাজস্ব ঘাটতি কাটাতে কেবল বড় করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে এসএমই খাতের জন্য বিশেষ কর অবকাশ এবং সহজ শর্তে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। মাঝারি শিল্পগুলো ঘুরে দাঁড়ালে তা স্ফূর্তভাবে পরোক্ষ কর ও ভ্যাট আদায়ের গ্রাফকে ওপরের দিকে তুলে আনবে।

রাজস্ব খাতের প্রতিটি স্তরে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সংগৃহীত করের প্রতিটি পয়সা কীভাবে এবং কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। কর কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা না থাকায় দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। স্বাধীন তদারকি ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি দুর্নীতিমুক্ত রাজস্ব বিভাগ গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।

লেখক: কলামিস্ট


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি   সুশাসন জরুরি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close