মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধন কমিটি, বিরোধীদের ওয়াকআউট      তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা      ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      
জীবনানন্দ
‘মানুষের ধর্ম’ রবীন্দ্রনাথ ও সমাজের দায়বদ্ধতা
অন্তর চন্দ্র
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৪৬ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

যখন পৃথিবীতে রক্ত, ক্লেদ, হিংসা-বিদ্বেষের ভয়াবহ আরতি ঠিক তখন পড়ছি রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষের ধর্ম’ মহানুভবতার কথা। প্রেমের কথা। সহমর্মিতার কথা। সমস্ত মহৎ হৃদয়ের কথা। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় মনুষ্যত্বের জয়জয়কার ধ্বনিত হয়েছে। মানবের অহমিকাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে এক ‘আমি’ মহৎ বিশ্বমানবতার ‘আমি’তে রূপান্তরিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

লালন কিংবা গগন হরকরার মনের মানুষ যেখানে উজ্জ্বল প্রভা নিয়ে বিশ্ব মানবতার জয়গান করে- রবীন্দ্রনাথ সেই বিশ্বমানবকে মানুষের কাতারে নিয়ে এসেছেন। দেখিয়ে দিয়েছেন, পূজার অর্ঘ্য শুধু দেবতাদের উদ্দেশ্যে নয়! বরং জীর্ণ-ক্লিষ্ট মানুষের সহযোগিতা সহমর্মিতার মধ্যে আত্ম-সাধনার স্থান; সে স্থানে হিংসা-নিন্দা-গ্লানি-বিদ্রুপ কিছুই প্রবেশ করতে পারে না, সেখানেই মানুষের ধর্ম। লালন যেমন বলেন- ‘সহজ মানুষ ভজে দেখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে’ সে জ্ঞান আমাদের নেই, তাই আমরা অমানুষ; মনুষ্যত্বে আমাদের উন্নত হতে হয়, তার জন্য সাধনা লাগে সে সাধনার কথাই রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের ভাষায় বলে গেছেন। উপনিষদ ছিল তার জীবনের অন্যতম উপলব্ধির জগৎ। উপনিষদের বাণীকে কেন্দ্র করে তিনি লিখলেন, ‘মানুষের ধর্ম’ মানুষের আবার ধর্ম হয় নাকি? অবশ্যই, হয়! সে ধর্ম ঈশ্বরের মহিমা গাওয়ার ধর্ম নয়! সহজ মানুষের ধর্ম। মানুষের মাঝে যে ঈশ্বর আর ঈশ্বরের মাঝে যে মানুষ তার ধর্ম রক্ষাই মানুষের ধর্ম।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ১৫ দিন পর কলকাতার আলবার্ট হলে কাজী নজরুল ইসলাম যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে তিনি বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে জানলে আর উপনিষদ পড়তে হয় না! তিনিই জীবন্ত উপনিষদ।’ সে কথার সত্যতা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য কর্মে সাধনায় প্রমাণিত হয়। ক্ষিতিমোহন সেন ও বিধু শেখর শাস্ত্রীর মতো মানুষ সঙ্গী ছিলেন জন্য রবীন্দ্রনাথ সহজ মানুষের জীবনকে আরও বেশি পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছেন। যে উদারতার কাছে এখন মানুষ অসহায়! এ বাড়ির লোক ও বাড়ির লোকের সাথে কথা বলে না- সে সময়কে উপেক্ষা করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মানুষের ধর্ম’ পড়ার দুঃসাহসিকতা দেখাবার প্রয়োজন পড়েছে। পৃথিবী যখন পারমাণবিক বোমার ভয়াবহ আরতির সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে- যখন প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে মহানুভবতা কমে আসছে, তখন রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষের ধর্ম’ পড়ার আহ্বান জানানো খুব দরকার। মহৎ হৃদয়গুলোর একীভূত বিস্ফোরণ দরকার। কেননা মানুষের হৃদয় পাথর নয়! ভালোবাসায় পরিপূর্ণ! সে ভালোবাসার উৎকর্ষ দরকার। জাতি-বর্ণ, ভেদ-অভেদ, ভালো-মন্দ সমস্ত কিছুকে আপন করে নিয়েই সত্যের পথে অগ্রসর হতে হবে। সত্য চিরকালই সত্য! সত্যের পূজারি রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর সুখ-ঐশ্বর্য, ভোগ-বিলাসের কামনায় বসে থাকবার কথা বলেননি বরং তিনি স্ব-মহিমায় উঠে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন। উপনিষদের প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন, ‘ভগবান, মানুষের স্ব-মহিমায় প্রতিষ্ঠিত।’ তাই মানুষের কীর্তনই তো পৃথিবীর ধর্ম। তার জন্য অতিমানব হওয়ার প্রয়োজন নেই। দালভ্যের প্রশ্ন ও প্রবাহণের উত্তরে আমার আস্থা আছে। মানুষের কাতারে যদি দেবতাকে নিয়ে আসা না যায়, তবে পূজার অর্ঘ্য ওই দেবতার জন্য নয়।

মানুষের প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রেম জীবপ্রকৃতির প্রেরণায়; ত্যাগ ও তপস্যার পটভূমিতে তার সাধনা। ভূমিকা লিখতে গিয়ে তিনি বলেছেন... ‘‘আমাদের অন্তরে এমন কে আছেন যিনি মানব অথচ যিনি ব্যক্তিগত মানবকে অতিক্রম করে ‘সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ’। তিনি সর্বজনীন সর্বকালীন মানব। তারই আকর্ষণে মানুষের চিন্তায়-ভাবে কর্মে সর্বজনীনতার আবির্ভাব।’’ তার অবস্থান হৃদয়ের গহিনে প্রতিধ্বনিত হয়। গৌতম বুদ্ধের মতো মহৎ হৃদয়, যিশুখ্রিস্টের মতো ধৈর্যশীল মহাত্মা, যারা মানুষের জন্য অকাতরে জীবন দিয়েছেন তাদের হৃদয়ে সেই বিশ্বমানবের অধিষ্ঠান। বিশ্বমানবকে বিশ্বআত্মার সঙ্গে জুড়ে দিতে রবীন্দ্রনাথ জ্ঞানের পথে অগ্রসর হতে বলেছেন, জ্ঞান মার্গের সুচিন্তিত পথই সার্থকতার দিকে নিয়ে যাবে। তখন মানুষের সাথে মানুষের হৃদয়ের পার্থক্য থাকবে না। সমস্ত হৃদয় একীভূত হবে।

উপনিষদের চিন্তা-চেতনায় রবীন্দ্রনাথের ভাবনার পরিধিজুড়ে যখন ‘মানুষের ধর্ম’ মহৎ হয়ে উঠেছে! বৈদিক সাহিত্যের বাস্তবতা তখন আরও মুখর করে তোলে- রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘পশু বলছে, ‘সহজ ধর্মের পথে ভোগ করো।’ মানুষ বলছে, ‘মানব ধর্মের দিকে তপস্যা করো।’ যাদের মন মন্থর- যারা বলে, যা আছে তাই ভালো, যা হয়ে গেছে তাই শ্রেষ্ঠ, তারা রইল জন্তু ধর্মের স্থাবর বেড়াটার মধ্যে; তারা মুক্ত নয়, তারা স্বভাব থেকে ভ্রষ্ট। তারা পূর্বসঞ্চিত ঐশ্বর্যকে বিকৃত করে, নষ্ট করে। প্রবৃত্তিমার্গের ভোগবাদী পথের চিন্তা আমাদের ক্লান্ত-শ্রান্ত করে তোলে কিন্তু নিবৃত্তিমার্গের সহজ পথে পা বাড়ানোর জন্য আমাদের হৃদয় ব্যাকুল নয়, তাই সংশয়, অভাব, বেদনার নীলে পুড়ে যাচ্ছে সমস্ত মহৎ হৃদয়। পৃথিবীতে জন্মলাভ করার সার্থকতা কোথায়? মানুষের মহত্ত্বে। সেই মহত্ত্বে¡ কোথায়? রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘শুভকর্মে।’ যদি নিজেকে জিজ্ঞেস করি, ‘কতটি শুভকর্মের জন্য নিজেকে ধন্যবাদ দিয়েছি?’ লজ্জায় মাথা নত করে চলে যেতে হয় অন্যদিকে; নিজের অহমিকার পাহাড় গড়ে তুলে ‘অহং’-এর সাধনায় ব্যস্ত মানুষ, রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষের ধর্ম’ সম্পর্কে কতটা উৎকর্ষ পাবে। যেখানে- লালন, হাছন নিগৃহীত! রবীন্দ্রনাথ বেদনায় জর্জরিত; নজরুল আতঙ্কিত সেখানে প্রেমের কথা, মানবতার কথা বলে লাভ কি? জাতিগত, সম্প্রদায়গত, হিংসা-বিদ্বেষ যখন প্রবল হয়ে ওঠে! তখন মহৎ হৃদয়ের প্রয়োজন পড়ে, সে হৃদয় জন্মাবার উৎকর্ষ কোথায়? চারদিকে হানাহানি কাটাকাটি- এর মধ্যেই তো জীবন। কারো চাওয়ার কিছু নেই; পাওয়ারও হয়তো বা কিছু নেই, হয়তো বা অনেক কিছুই আছে কিন্তু কেউই পাচ্ছে না, তার মূলে রয়েছে মনুষ্যত্বহীনতা। যখন মনুষ্যত্বের উন্নতি হবে, তখন মানুষ হয়ে উঠবে দেবতা আর সেই দেবতার পায়ে পুষ্পার্ঘ্য দেওয়ার সৌভাগ্য হয়তো বা আমাদের নেই; নয়তো মনুষ্যত্বের অভাববোধ আজকে এত প্রখর হয়ে উঠতো না।

সমাজের হীনমন্যতার কথা বলে আর লজ্জার মাথা খাব না, সমাজপতিরা নিজেদের ভোগবিলাসে ব্যস্ত; তাদের ব্যাংক ব্যালেন্সে অনাহারী মানুষের সেবাধর্ম হয় না। বাড়ির পাশে কেউ একজন পড়ে থাকলেও খোঁজখবর নেয় না, ‘কেমন আছেন?’ অথচ ন্যায়ধর্মের কথা তাদের মুখ থেকেই বেড়োয়। এইরকম প্রহসনের মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভঙ্গুর দিনগুলোর মধ্যে নারী-পুরুষ কেউই নিরাপদ নন! তারা যদি একটু উঠে দাঁড়ানোর সাহস পেত সভ্যতার ইতিহাসে সেটিই শ্রেষ্ঠ বলে পরিগণিত হতো কিন্তু ইতিহাস দুর্বল মানুষদের ব্যবহার করেছেন, সমাজের চরম শিখরে ওঠার ক্ষমতা তাদের নাই। যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই পশুত্ব শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ সেইসব হীনমন্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথকে আমরা ভালবাসতে পারি না, অন্যায়কে ন্যায় আর ন্যায়কে অন্যায় বলে দিনাতিপাত করছি।

বর্তমান সমাজে যে অন্ধকার যুগের সূচনা দেখা যাচ্ছে তা রবীন্দ্রনাথের কথায় উঠে এসেছে- তিনি পারিবারিকভাবে আভিজাত্যের মধ্য দিয়ে বড় হলেও মনে মনে উদাসীন ছিলেন। তার বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচারক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একদমই আলাদা ছিলেন, ঐশ্বর্যের মোহ থেকে বেরিয়ে এসে সৃষ্টির অপূর্ব লীলায়িত ভাবধারাকে ঊর্ধ্বমুখী করে পূর্ণত্বের দিকে লক্ষ্যভেদ করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমাদের পরিবারে যে-ধর্ম সাধনা ছিল আমার সঙ্গে তাহার কোন সংস্রব ছিল না- আমি তাহাকে গ্রহণ করি নাই। আমি কেবল আমার হৃদয়াবেগের চুলাতে হাপর করিয়া করিয়া মস্ত একটা আগুন জ্বালাইতেছিলাম।” তবুও একদল এসে বলবে যে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু কিংবা ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী কিংবা সেই লক্ষ্যে তিনি ধর্ম প্রচারের তাগিদে এইসব লেখালেখি করেছেন। যারা এই কথাগুলো বলে তারা রবীন্দ্রনাথকে জানেন না, তাদের সাহিত্য সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। ধর্মাধর্ম করে পুরো একটা জাতি রসাতলে গেল কিন্তু কোথাও কি কারো উপকার হয়েছে? হয়নি তো! আমরা না পারি সত্যকে ভেতরে প্রতিষ্ঠা করতে না পারি ধর্মকে সত্যের সাথে গ্রহণ করতে; হিংস্রতা এখন প্রবল হচ্ছে বর্তমান সমাজের যেভাবে ক্ষতি হচ্ছে অন্যদিকে সাহিত্যের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। এই বৈষম্য সৃষ্টির কারিগর যারা তারা শুধু মানুষকে ব্যবহারের দ্বারা নিজেকে পরিশুদ্ধ রেখেছেন আর আমরা তাদের পায়ের কাছে সর্বস্ব বিকিয়ে দিচ্ছি। সবচেয়ে বড় কথা বাঙালি রবীন্দ্রনাথ বোঝে না, বোঝার চেষ্টাও করে না, শুধু সমালোচনার মাধ্যমে নিজেকে সংযত রাখেন।

রবীন্দ্রনাথ বলেন, “আমরা ধর্মকে যেখানে সত্যে প্রতিষ্ঠিত করিতে না পারি সেখানে ভাবুকতা দিয়া আর্টের শ্রেণিভুক্ত করিয়া তাহার সমর্থন করি।” এই মূল্যবান কথার পরে আর কোন কথা থাকতে পারে না। আমরা ধর্মকে ব্যবহার করি নিজের স্বার্থের জন্য কিন্তু মানুষের মহানুভবতার জন্য এতটুকু করতে রাজি নই, তাহলে কোথায় ‘মানুষের ধর্ম?’ যেখানে, মানবতা প্রশ্নবিদ্ধ! তাহলে মানুষ কোথায়? সমাজের দায়বদ্ধতা কোথায়? ভালো মানুষ তৈরিতে যে সাধনার প্রয়োজন তা যদি সমাজের বিষয় হয়, তাহলে সমাজের মানুষেরা কেন ভালো মানুষ তৈরিতে সচেষ্ট নয়! তার কারণ তারা নিজেরাই অসত্যের পথে চলেন। সত্যের পথে চলার জন্য কেউই বলেন না। সত্য এলে আলো আসবে আর আলো আসলে অন্ধকার দূরে যাবে। তখন তাদের ব্যবসা বন্ধ হবে- এই ভয়ে। তার সব তছনছ করে দেবে, শুধু সত্যকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। সংস্কৃতিতে তাদের আস্থা নেই, সংস্কারেও নেই; বোধের অভাব আজ আমাদের, আমরা বাঙালিরা সংস্কৃতি মনা হতে জানি না, আমাদের ভেতরে অন্ধকার বাসা বেঁধে আছে, সুন্দরকে সুন্দররূপে গ্রহণ করার ক্ষমতা দিন দিন কমে আসছে। সুন্দরের রূপ গান কীর্তনই আজ খুব প্রয়োজন।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “ভারতবর্ষের কল্যাণ যদি চাই তাহলে হিন্দু-মুসলমানে কেবল যে মিলিত হতে হবে তা নয়, সমকক্ষ হতে হবে। সেই সমকক্ষতা তাল-ঠেকা পালোয়ানির ব্যক্তিগত সমকক্ষতা নয়, উভয় পক্ষের সামাজিক শক্তির সমকক্ষতা।” (কালান্তর) সমাজের ভেদ-জ্ঞান কেটে গেলে আমরা পরিশুদ্ধ হবো। মানুষের সাথে মানুষের সহমর্মিতা বিশ্বহৃদয়ের সাথে মিলে সমস্ত মহৎ হৃদয়গুলোর একীভূত শক্তিই পারে মহাজীবন দান করতে। রবীন্দ্রনাথ যে আশার বাণী শুনিয়েছেন, উপনিষদের পরম মমতায় সে কথায় একত্ব হতে আরও বহু সময়ের প্রয়োজন। শিক্ষা ও জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে হবে। একমাত্র আলোর পথেই আমাদের যাত্রা। ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়।’ সহজ মানুষের পথে, সহজ লোকের পথে মানব ধর্মের জয় জয়কার ধ্বনিত হোক বিশ্বহৃদয়ের সন্নিবেশিত আয়োজনে।

“কী জানি কী হল আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ,
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।
সেই সাগরের পানে হৃদয় ছুটিতে চায়,
তারি পদপ্রান্তে গিয়ে জীবন টুটিতে চায়।”

আরও বলেন...“মানবধর্ম সম্বন্ধে যে বক্তৃতা করেছি, সংক্ষেপে এই তার ভূমিকা। এই মহাসমুদ্রকে এখন নাম দিয়েছি মহামানব। সমস্ত মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ বর্তমান নিয়ে তিনি সর্বজনীন হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত। তার সঙ্গে গিয়ে মেলবারই এই ডাক।”

বিশ্বমানবতার সাথে সেই পরম পুরুষের সঙ্গে মিলে যাওয়ার কথা বলে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়েছেন, মানব প্রেমকে জাগরিত করার কথা বলেছেন, হৃদয়ের মাঝে সুপ্ত প্রাণকে উদ্ভাসিত করে জেগে উঠতে বলেছেন আর মহামানবের মহাসমুদ্রে লীন হয়ে যাওয়ার আহ্বান শুনে যেন মনে হয়....

“না জানি কেন রে এতদিন পরে
জাগিয়া উঠিল প্রাণ!”

উপনিষদের ভাষায় এই প্রাণই সত্য! পরমতত্ত্ব। প্রাণ আছে বলেই, হাঁটা চলা কথা বলা আরও কত্ত কি! সেই মহৎ প্রাণকে জীবের কল্যাণে জেগে ওঠার বাণী বলেছেন কবি। সকল মহৎ প্রাণ মানুষের জন্য জেগে উঠুন।

এই হোক আমাদের বোধের ভাষা। তিনি যা চেয়েছিলেন, তার কণামাত্রও করার চেষ্টা করি না, এতটাই দুর্ভাগ্য! বাঙালির শ্রেষ্ঠ পুরুষের আহ্বানে সাড়া দেবার মতো চোখ, কান, স্পর্শের বড় অভাব। এ সকল জটিলতা থেকে উঠে এসে- মানবতার দিকে হাত বাড়াতে হবে। মানুষের সাথে মানুষের। হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের। সংলাপ চলুক সারাজীবন। সে কথা হোক সহমর্মিতার। সহযোগিতার। বোধের। সকলেই সুখী হোক।

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  ধর্ম   রবীন্দ্রনাথ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close