শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হবে, তাদের সামনে শুধু ক্ষমতা গ্রহণের প্রশ্ন নয়, তাদের সব থেকে বড় দায়িত্ব হলো দেশের স্থিতিশীলতাকে ফিরিয়ে আনা। কারণ এ নির্বাচনকে ঘিরে দেশ রাজনৈতিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত পার করছে। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ভোটগ্রহণ শেষে নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রথম দাবি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদি শাসনব্যবস্থা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অস্থিরতা ও নানমুখী সংঘাতের পর একটি কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি নাগরিক আস্থার ভিত্তি। অতীতের বিতর্ক ও রাজনৈতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারকে স্বচ্ছতা, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং সংসদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। একটি অন্তর্বর্তী পর্বের পর দেশ আবার নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব বেছে নিয়েছে যা বাংলাদেশের এটি গণতন্ত্রের উত্তরণের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। যে দলই হারুক বা জিতুক সব দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সহনশীল আচরণ জরুরি। বিজয়ীরব প্রতিশোধ পরায়ণ হলে গনতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে বীজিতদের প্রতি কোনো ধরনের দমন পীড়ন কাম্য নয়।
নতুন সরকারের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগের পরিবেশ- এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে না পারলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল নাগরিক জীবনে প্রতিফলিত হবে না। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতি ফিরিয়ে আনা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি।নির্বাচন পরবর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, দুর্নীতি দমন এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা না গেলে জনগণের প্রত্যাশা ভেঙে পড়বে।
গবেষণা ও বিশ্লেষণে বারবার বলা হয়েছে, কার্যকর জবাবদিহি ছাড়া গণতান্ত্রিক রূপান্তর টেকসই হয় না। নতুন সংসদে নানামুখী মত ও শক্তির প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এ বাস্তবতায় সংলাপের সংস্কৃতি তৈরি করা, বিরোধী দলের ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতামুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখা সরকারের বড় পরীক্ষা হবে। নির্বাচনপরবর্তী উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এখন জরুরি। এ নির্বাচনকে অনেকেই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাই প্রশাসনিক, বিচারিক ও নির্বাচনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার শুরু করা নতুন সরকারের জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ হবে। শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে সমাজে। সেই প্রত্যাশাকেও মূল্যায়ন করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে নতুন সরকারের সেটি হলো সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, শ্রমিক ও কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণে জোরারোপ করা। এসব দিক গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করে। গণতান্ত্রিক উদার এ নীতিগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে, শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক সংহতিও নিশ্চিত হয়। গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নেতৃত্বের নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নতুন সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
সবশেষে, নির্বাচনের ফল যাই হোক, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক তাদের মনে রাখতে হবে- এ দায়িত্ব শুধু দলীয় নয়, রাষ্ট্রীয়। জনগণ একটি কার্যকর, দায়িত্বশীল ও মানবিক, ন্যায় ও ইনসাফের সরকার চায় যেখানে ক্ষমতার উৎস থাকবে জনগণ। এটাই নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা।
কেকে/এমএ