রমজান সংযমের মাস। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সময়েই তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ে। রাজধানীর মিরপুরে পল্লবীতে একটি কারখানার শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ সেই আশঙ্কাকেই সামনে এনে দিয়েছে। বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ না হলে ঈদের আগে শ্রমিকরা যে রাস্তায় নামবেন, তা নতুন কিছু নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতিবছরের পুনরাবৃত্ত সংকটকেই নিয়তি হিসেবে মেনে নেব?
ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, এটি নৈতিক দায়িত্বও। শ্রমিকরা সারা বছর যে শ্রম দেন, তার ন্যায্য প্রাপ্য সময়মতো না পেলে ক্ষোভ তৈরি হবেই। এই ক্ষোভ যখন রাস্তায় নামে, তখন তা শুধু একটি কারখানার সমস্যা থাকে না; তা হয়ে ওঠে আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
এবার পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। নতুন সরকার সদ্য দায়িত্ব নিয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ১৫ শতাংশ শুল্ককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা দ্বিধায় রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক বাজার। সেখানে অর্ডার কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে কারখানার নগদ প্রবাহে, মুনাফায় এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের বেতনে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে ক্রেতারা ন্যূনতম অর্ডার দিচ্ছেন। অন্যদিকে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন ঈদের আগে বেতন-বোনাস পরিশোধে চাপ মোকাবিলায় প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার স্বল্পসুদে ঋণ চেয়েছে। পাশাপাশি কয়েক হাজার কোটি টাকার নগদ প্রণোদনা দ্রুত ছাড়ের অনুরোধ জানিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, কেন প্রতিবছরই ঈদের আগে ‘বিশেষ সহায়তা’ দরকার হয়? যদি শিল্পটি দেশের রপ্তানির মেরুদণ্ড হয়, তবে এর আর্থিক ব্যবস্থাপনাও হতে হবে টেকসই ও পরিকল্পিত। শুধু ঋণ দিয়ে সংকট সামাল দিলে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের মতো স্থায়ী কাঠামো।
সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষকে আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি অর্থনৈতিক নীতি, বাণিজ্য কূটনীতি এবং শিল্প ব্যবস্থাপনার সমন্বিত সংকেত। দ্রুত প্রণোদনা ছাড়, ব্যাংকিং সহায়তা এবং রপ্তানি বাজারে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে মালিকপক্ষকে কঠোরভাবে জানাতে হবে, বেতন-বোনাসে গাফিলতি বরদাশত করা হবে না।
শ্রমিকদের ক্ষোভকে কেউ যেন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অস্থিরতা একসঙ্গে মিললে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
তৈরি পোশাক খাত শুধু রপ্তানি আয়ের উৎস নয়; এটি লাখো পরিবারের জীবিকা। রমজানের এই সময়ে শ্রমিকের ঘরে যদি অনিশ্চয়তা ঢুকে পড়ে, তবে তার অভিঘাত সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নয়তো প্রতিবছরের মতো আবারও ঈদের আগে সড়কে অস্থিরতা সবাইকে ভোগাবে।
কেকে/ এমএস