পৃথিবীর সব সভ্য রাষ্ট্রে ব্যক্তি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র- প্রতিটি স্তরের অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন দেওয়ার রীতি প্রচলিত। সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি, সমাজসেবা- যেকোনো ক্ষেত্রে কেউ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলে রাষ্ট্র তাকে সম্মানিত করে। কিন্তু বাংলাদেশে এক ব্যতিক্রমী বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তাসাউফপন্থী পীর-আউলিয়া ও সুফি সাধকগণ এই ভূখণ্ডের মানুষকে নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সামাজিকভাবে গড়ে তুলতে শতাব্দীর পর শতাব্দী নিরলস কাজ করে গেছেন। অথচ তাঁদের এই অপরিমেয় খেদমত আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সামাজিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :
বাংলার প্রতিটি জনপদে একসময় ইসলামের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। দূর-দূরান্ত থেকে আগত সুফি সাধকগণ এই মাটিতে এসে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের তাজা রক্ত এই মাটির প্রতিটি স্তরে মিশে আছে। আজও বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা অগণিত নামহীন মাজার সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। এই মহান সাধকগণ কেবল আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ছিলেন না- তাঁরা ছিলেন সমাজ সংস্কারক, শিক্ষানুরাগী এবং মানবতার অকৃত্রিম সেবক।
সুফি সিলসিলার মহান ধারা : উপমহাদেশে ইসলামের আলোকবর্তিকা
বাংলাদেশে ইসলামের যে শিকড় এত গভীরে প্রোথিত, তার পেছনে রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ও সুশৃঙ্খল আধ্যাত্মিক সিলসিলার অবদান। এই সিলসিলার সূচনা হয়েছে উপমহাদেশের প্রাথমিক সুফি সাধকদের হাত ধরে এবং তা আজও অব্যাহত গতিতে প্রবাহিত হয়ে চলেছে।
আরও পড়ুন :
প্রারম্ভিক সুফি সাধকগণ:
বাংলায় ইসলামের প্রথম আলো যাঁরা জ্বালিয়েছিলেন, তাঁদের স্মৃতি আজও এই ভূমিতে অম্লান। সিলেটের হযরত শাহ জালাল রহ., খুলনার হযরত খানজাহান আলী রহ., রংপুরের হযরত জালালুদ্দীন বোখারী রহ., নেত্রকোণার হযরত সুলতান কমরুদ্দীন রুমী রহ., রাজশাহীর হযরত শাহ মাখদুম রূপোস রহ., ঢাকার হযরত পীর মালেক ইয়েমেনী রহ. এবং সূত্রাপুরের হযরত শাহ আব্দুর রহিম শহীদ কাশ্মীরী রহ.- এঁরা প্রত্যেকেই এই বাংলার মাটিতে ইসলামের বীজ বপন করেছেন এবং তাঁদের মাজারগুলো আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভক্তির কেন্দ্র।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভীর (রহ.) সিলসিলা :
উপমহাদেশের ইসলামি পুনর্জাগরণের সবচেয়ে শক্তিশালী ধারাটি প্রবাহিত হয়েছে হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.-এর খান্দানের মাধ্যমে। তাঁর পুত্র শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভীর (রহ.) বিখ্যাত খলিফা সৈয়দ আহমদ বেরলভী রহ. এই সিলসিলাকে বাংলা ও ভারতের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দুজন বিশিষ্ট খলিফা- সুফি নূর মুহাম্মদ নিজামপুরী, হযরত কারামত আলী জৌনপুরী, মাওলানা গোলজার শাহ, নোয়াখালীর মাওলানা ইমামুদ্দীন বাঙালী, সাতকানিয়ার মাওলানা আবদুল হাকিম- বাংলা ও ভারতজুড়ে ইলম ও তরিকতের যে বিশাল খেদমত আনজাম দিয়েছেন, তা ইতিহাসে অতুলনীয়।
দিওয়ানে ওয়াইসির প্রণেতা : শাহ সূফী সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি রহ.
সুফি নূর মুহাম্মদ নিজামপুরীর (রহ.) এই সিলসিলার এক অনন্য রত্ন হলেন পীরে তরিকত শাহ সূফী সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি রহ.। দিওয়ানে ওয়াইসির প্রণেতা এই মহান সাধক রাসূলনোমা পীর হিসেবে সর্বমহলে প্রসিদ্ধ। জন্মসূত্রে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার সন্তান হলেও তিনি কলকাতায় বড় হয়েছেন, সেখানেই শিক্ষালাভ করেছেন এবং জ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছেন। তাঁর মাজার কলকাতার মানিকতলায় অবস্থিত। তাঁর সিলসিলা বাংলা ও ভারতে অভাবনীয়ভাবে বিস্তার লাভ করেছে। এই সিলসিলার প্রধান শাখা দরবারগুলো হলো- ফুরফুরা দরবার (ভারত), সুরেশ্বর দরবার (শরিয়তপুর), পাউসার দরবার (মুন্সিগঞ্জ) এবং ভারতের মেহেদীবাগ দরবার। এর উপশাখা দরবারগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- ছারছিনা দরবার, সুফিয়া দরবার, এনায়েতপুর পাক দরবার ও ছতুরা দরবার। চট্টগ্রামে এই সিলসিলার প্রধান দুটি কেন্দ্র হলো হালিশহর দরবার এবং গারাংগিয়া দরবার- যাদের শাখায় আবার গড়ে উঠেছে কুতুব শরীফ দরবার ও কাগতিয়া দরবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে হযরত কারামত আলী জৌনপুরী রহ.-এর সিলসিলায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো সিলেটের ফুলতলী দরবার, যা আজও শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। অন্যদিকে কুমিল্লার হযরত মাওলানা গোলজার শাহ রহ.-এর সিলসিলায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ঢাকার নারিন্দার হযরত শাহ আহছানুল্লাহ রহ.।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিলসিলা:
চট্টগ্রামের হযরত শাহ আমানতের (রহ.) সিলসিলার মাধ্যমে ঢাকার আজিমপুর দরবার শরীফ, চট্টগ্রাম আনোয়ার ওষখাইন আলী রজা কানু শাহ এর দরবার এবং চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। এই দরবারগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষের আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল হিসেবে আজও সক্রিয়। এছাড়া আবুল উলাইয়া সিলসিলার মাধ্যমে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার মির্জাখিল দরবার শরীফও এই অঞ্চলে ইসলামের খেদমতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। এই সুদীর্ঘ সিলসিলার দিকে দৃষ্টি দিলে স্পষ্ট হয়ে যায় - বাংলাদেশের ইসলামি ঐতিহ্য কতটা গভীর, কতটা সমৃদ্ধ এবং কতটা সুসংগঠিত। এই আধ্যাত্মিক ধারা শুধু অতীতের গৌরব নয় - এটি একটি জীবন্ত ও প্রবাহমান ঐতিহ্য, যা আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে আলোকিত করে চলেছে।
উল্লেখযোগ্য অবদান :
বাংলাদেশের তাসাউফ-ঐতিহ্যের এই ধারায় অনেক মনীষীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখার যোগ্য। হযরত মাওলানা খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী রহ. সিরাজগঞ্জে যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি গড়েছেন, মাজার সংলগ্ন বিশাল হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ আজও তাঁর খেদমতের জীবন্ত প্রমাণ বহন করছে। হযরত শাহ সূফী মাওলানা নেছার উদ্দীন আহমেদ রহ. বরিশালের এই প্রখ্যাত আলেম ও পীরে তরিকত ছারছিনা মাদ্রাসা এবং দারুন্নাজাত মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে শিক্ষাবিপ্লব ঘটিয়েছেন, তাঁর সিলসিলার অনুসারীরা আজও সারা দেশে সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। সোনাকান্দার পীর সাহেব সোনাকান্দা কামিল মাদ্রাসাসহ প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে এবং মিরসরাইয়ের মাওলানা আব্দুল গনি রহ. সুফিয়া মাদ্রাসার মাধ্যমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। মাওলানা অধ্যাপক আবদুল খালেক এমএ ছতুরভী রহ. যিনি ফেনী কলেজ, বদরুন্নেছা মহিলা কলেজ, ইডেন কলেজ এবং ভারতের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতা এবং লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজের অধ্যাপনা; পাশাপাশি পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন (তালিমাতে ইসলামিয়ার পূর্ব বাংলার সদস্য) এবং ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নিবার্চনের এম এল এ হিসেবে আলো ছড়িয়েছেন। মাওলানা আব্দুল মজিদ ও মাওলানা আব্দুর রশিদ রহ. সাতকানিয়ার গারাংগিয়া অঞ্চলের এই দুই মহান মনীষী মজিদিয়া মাদ্রাসাসহ সারাদেশে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাঁদের সিলসিলার বিস্তার আজও অব্যাহত। বায়তুশ শরফের পীর মাওলানা আব্দুল জব্বার রহ. বায়তুশ শরফ মাদ্রাসাসহ বহু আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা ও ধর্মের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। পাকিস্তানের ছিরিকোট দরবার শরীফের সিলসিলা চট্টগ্রামের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসাসহ অসংখ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সেবায় আজও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
ড. প্রফেসর নুরুল আলম: একজন বিশ্বমানের আলেম ও আধ্যাত্মিক পথিকৃৎ
বর্তমান যুগে ইলম ও তাসাউফের সমন্বয়ে যাঁরা বৈশ্বিক পর্যায়ে ইসলামের খেদমত করে যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে ড. প্রফেসর নুরুল আলম মাদ্দাজিল্লুহু একটি অনন্য ও উজ্জ্বল নাম। চট্টগ্রামের পটিয়ার কৃতিসন্তান এই মনীষী একাধারে বিশ্বমানের একাডেমিশিয়ান এবং তরিকতের একজন কামেল মুর্শিদ- যা আজকের দুনিয়ায় অত্যন্ত বিরল। তিনি কানাডার বিখ্যাত ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন যাবত বিশ্বমানের একাডেমিক শিক্ষাদান করে আসছেন। বহু গ্রন্থের প্রণেতা এই মনীষী জাতিসংঘের অধীনে আফ্রিকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শিক্ষা উন্নয়নেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। আধ্যাত্মিক পরিচয়ে তিনি গারাংগিয়া দরবারের মহান দুই মনীষী- হযরত মাওলানা আব্দুল মজিদ ও হযরত মাওলানা আব্দুর রশিদের (রহ.) সুযোগ্য খলিফা। বিশ্বের আরব, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকাসহ নানা প্রান্তের বহু ভাষাভাষী মানুষ তাঁর হাত ধরে তরিকত গ্রহণ করে আধ্যাত্মিক পরিপক্বতা অর্জন করেছেন। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও জুম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ‘‘মাহফিলে নূর’’-এর ব্যানারে পরিচালিত তাঁর বৈশ্বিক কার্যক্রম আধুনিক প্রযুক্তিকে ইসলামের খেদমতে ব্যবহারের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। এছাড়া অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় এবং শিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তায় তাঁর অবদান অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ একাডেমিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও তিনি ধর্মকে কখনো পুঁজি বা ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি- এটিই তাঁকে সত্যিকারের মহান করে তোলে।
ঢাকার বুকে ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্যবাহী খানকা: বকশিবাজার দরবার শরীফ
ঢাকার বকশিবাজারের এই ঐতিহাসিক খানকা শরীফ ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক খেদমতের আঞ্জাম দিয়ে আসছে। রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই খানকা শরীফ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে মানুষের আধ্যাত্মিক পিপাসা মেটানোর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। বর্তমান গদিনশীন পীর সাঈদ আনোয়ার মোবারকী মাদ্দাজিল্লুহু এই মহান ঐতিহ্য অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে বহন করে চলেছেন। প্রতি মাসে শতাধিক মানুষকে মেহমানদারি করে খতমে খাজেগান ও গিয়ারভী শরীফের মজলিশ আয়োজন করা তাঁর নিয়মিত কার্যক্রম। বিশেষ মাহফিল ও আধ্যাত্মিক সমাবেশের মাধ্যমে তিনি ঢাকার মানুষের কাছে দ্বীনের আলো পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও অনুকরণীয় বিষয় হলো- এই বিশাল খেদমতের পুরো ব্যয়ভার তিনি নিজের ব্যবসায়িক উৎস থেকে বহন করেন। কোনো মুরিদের দান, নজরানা বা বাইরের অর্থায়নের উপর তিনি নির্ভরশীল নন। এটি কেবল আর্থিক স্বনির্ভরতার দৃষ্টান্ত নয়- এটি একজন প্রকৃত সুফি সাধকের নিঃস্বার্থ খেদমতের জীবন্ত প্রমাণ। যুগে যুগে প্রকৃত আউলিয়াগণ এভাবেই নিজের সম্পদ উৎসর্গ করে উম্মতের খেদমত করেছেন- সাঈদ আনোয়ার মোবারকী সেই মহান ঐতিহ্যেরই ধারক।
সুফিদের খেদমত: অতীত থেকে বর্তমান:
গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমাদের স্মরণ রাখতে হবে তা হলো- এই খেদমত শুধু ইতিহাসের পাতায় আবদ্ধ নয়। বর্তমানেও দেশের অগণিত মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা ও মক্তবের মাধ্যমে সুফি সাধকগণের উত্তরসূরিরা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। আত্মশুদ্ধি, নৈতিক চরিত্র গঠন ও মানবতার সেবায় তাঁরা আজও অকাতরে নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছেন। তাঁদের এই কাজের পেছনে নেই কোনো বৈশ্বিক অর্থায়ন, নেই কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। তাঁরা ধর্মকে পুঁজি হিসেবে বা ক্ষমতা অর্জনের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন না- বরং নিঃস্বার্থভাবে প্রকৃত ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত থাকেন।
বৈপরীত্যের এক তিক্ত চিত্র:
এখানে একটি বেদনাদায়ক বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থার অর্থায়নে যারা ইসলামের মূল কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত, তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কিং ও মিডিয়া কভারেজের কারণে রাষ্ট্র তাদের মূল্যায়ন করছে, পুরস্কৃত করছে। অথচ যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিনাপারিশ্রমিকে এই জাতির নৈতিক মেরুদণ্ড সোজা রাখার কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁরা রাষ্ট্রীয় দৃষ্টির বাইরে থেকে যাচ্ছেন। মূলনীতিটি সহজ- ধর্মের সাথে যখন অর্থের সম্পর্ক থাকে, তখন সেই ধর্মচর্চা আর বিশুদ্ধ থাকে না। যারা অর্থের বিনিময়ে ধর্মীয় কাজ করেন, তারা প্রকৃতপক্ষে ধর্মকে সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। পক্ষান্তরে প্রকৃত সুফি সাধকগণ সবসময় এই লোভ থেকে মুক্ত ছিলেন এবং আজও আছেন।
স্বীকৃতির দাবি কেন ন্যায়সঙ্গত:
একটু ভেবে দেখুন- একটিমাত্র কবিতা লিখে যিনি পুরস্কার পাচ্ছেন, সামান্য সমাজকাজ করে যিনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাচ্ছেন- তাঁদের যদি স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে যাঁরা শতাব্দী ধরে এই জাতিকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে গড়ে তুলেছেন, হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, লক্ষ লক্ষ মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছেন- তাঁদের অবদান কেন উপেক্ষিত থাকবে?
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘‘তোমরা নিয়ামতের শোকর আদায় করো, আমি তোমাদের নিয়ামত বাড়িয়ে দেব।” আউলিয়ায়ে কেরাম এই জাতিকে যে অফুরন্ত নিয়ামত দিয়ে গেছেন, সেই নিয়ামতের শোকর আদায় করা মানে তাঁদের অবদানকে স্বীকার করা, তাঁদের স্মরণ করা এবং তাঁদের দেখানো পথে চলা।
রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যমের কাছে আজ এই দাবি রাখছি- আউলিয়ায়ে কেরাম ও তাঁদের উত্তরসূরি সুফি সাধকদের অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করুন। এটি কেবল ধর্মীয় দাবি নয়, এটি ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের দাবি।
কেকে/এমএ