আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার পশুর হাটগুলোতে ইজারা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একদিকে রাজনৈতিক মহলের প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য, অন্যদিকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে চলেছে জননিরাপত্তা।
সম্প্রতি নিউমার্কেট এলাকায় খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এই আশঙ্কাকে কেবল উসকেই দেয়নি, বরং স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পশুর হাটের কাঁচা টাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে অপরাধী চক্র কতটা মরিয়া।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকার হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম জড়িয়ে পড়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ এবং অভিযুক্তদের পাল্টা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট যে, কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। কেবল আন্ডারওয়ার্ল্ড নয়, রাজনৈতিক মেরুকরণেও হাটের ইজারা এখন সংঘাতের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের মধ্যে দরপত্র জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে যাত্রাবাড়ী ও শ্যামপুরের মতো এলাকায় যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, তা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। পশুর হাট মানেই বিপুল অর্থের লেনদেন। আর এই লেনদেন ঘিরেই একদল অসাধু চক্র চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও পেশিশক্তি প্রদর্শনে লিপ্ত হয়। এর বাইরেও রয়েছে আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ও দুর্বল আইন প্রয়োগ- এই তিন কারণেই খুন-সহিংসতা, অস্থিরতা বাড়ছে।
সিটি করপোরেশনে নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দরে যখন দরপত্র জমা পড়ে, তখন তা আপাতদৃষ্টিতে রাজস্বের জন্য ইতিবাচক মনে হলেও এর নেপথ্যে থাকে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির নীল নকশা। এর প্রভাবে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত ইজারা ও চাঁদাবাজির মাশুল গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে পশুর উচ্চমূল্যের মাধ্যমে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে র্যাবের পক্ষ থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নজরদারিতে রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এটি প্রশংসনীয় হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন জরুরি।
নিউমার্কেটের মতো ব্যস্ত এলাকায় প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের পর খুনিদের গ্রেপ্তার করতে না পারা বা তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তোলে। অপরাধী যে দলের বা যে গোষ্ঠীরই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়- এই বার্তাটি প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে পৌঁছানো দরকার। কুরবানি একটি ধর্মীয় ও আবেগীয় বিষয়। পশুর হাটগুলো যেন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বা পেশিশক্তি প্রদর্শনের রণক্ষেত্রে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে নতুন সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুনরুত্থানকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। হাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল পোশাকধারী পুলিশ নয়, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং ইজারা প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি সিন্ডিকেটমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
মানুষ যেন ভয়হীন পরিবেশে উৎসবে অংশ নিতে পারে, প্রশাসনকে সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। পশুর হাট অপরাজনীতি প্রতিহত করতে হবে। আইনের শাসনই হোক সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা।
কেকে/ এমএস