মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      ভূমিকম্পে কাঁপলো রাজধানী      চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী      ৯ বিষয়ে একমত বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া      হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
একটি সমন্বিত গবেষণামূলক পর্যালোচনা
তৌহিদি জনতা, মব-সংস্কৃতি ও মাজার বিতর্ক
কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ৭:১৩ পিএম

বাংলাদেশের সমকালীন ধর্মীয় পরিসরে তিনটি প্রশ্ন আজ একসূত্রে জড়িয়ে পড়েছে-‘তৌহিদি জনতা’ নামক মব-সংস্কৃতির উত্থান, সুফিবাদের বহুস্তরীয় সংকট ও মাজারকেন্দ্রিক আচারের বৈধতা বিতর্ক। এই তিনটি বিষয় আলাদাভাবে বিচার করলে বাস্তবতার একটি বড় অংশই অনুপস্থিত থেকে যায়, কারণ একটি অন্যটির জন্ম দিচ্ছে এবং একটি অন্যটিকে জ্বালানি সরবরাহ করছে। নিচে তিনটি স্বতন্ত্র গবেষণা-পর্যবেক্ষণ হুবহু উপস্থাপন করা হলো, যা একত্রে পাঠ করলে সমস্যার শিকড় ও সমাধানের পথ উভয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথম পর্যবেক্ষণ

তৌহিদি জনতা ও মব-সংস্কৃতি: মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ

‘তৌহিদি জনতা’-শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে তৌহিদ বা একত্ববাদ এবং জনতা বা জনগণের একটি সামষ্টিক সমন্বয়, যার ব্যবহারিক অর্থ দাঁড়ায় ‘আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠী’। তবে সমকালীন প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োগিক রূপটি ভিন্নতর। বর্তমানে এই আত্মপরিচয়টি এমন এক রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর সমার্থক হয়ে উঠেছে, যারা নিজেদের নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে অবস্থানরত অন্যদের ‘মুশরিক’ বা ‘কাফের’ হিসেবে গণ্য করছে এবং পরকাল বা রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার অপেক্ষা না করে নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিতে সচেষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের মানদণ্ড কেবল কোনো পক্ষের দাবি বা ধারণার ওপর নির্ভরশীল নয়। শিরক কিংবা বিদআতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হতে হয় উভয় পক্ষের জ্ঞানতাত্ত্বিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ইসলামের মৌলিক নীতি অনুসারে কোনো বিষয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা জোরপূর্বক আরোপ না করে সংলাপে বসতে হয়। শরিয়ত নির্দেশিত পন্থায় যা বর্জনীয় তা বর্জন এবং যা গ্রহণীয় তা গ্রহণের জন্য একটি সুস্থ ও পারস্পরিক আলোচনার পরিবেশ অপরিহার্য।


দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান সময়ে কোনো প্রকার সংলাপ ছাড়াই যে ‘মব’ বা উন্মত্ত জনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা শরিয়তের দৃষ্টিতে স্পষ্টত না-জায়েজ। ইসলামের প্রচার ও সংস্কারের প্রধান পদ্ধতি হলো দাওয়াত ও পরামর্শ (কনসাল্টেশন); এরপরও যদি সমাধান না আসে তবে ফতোয়ার অবকাশ থাকে। সেই ফতোয়াও হতে হয় নিরপেক্ষ এবং কঠোরভাবে শরিয়ত সমর্থিত, কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে তুষ্ট করার জন্য নয়। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মহানবী (সা.) কখনোই প্রথমে আঘাত করার অনুমতি দেননি; তিনি সর্বদা প্রতিরোধের নীতি অনুসরণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তা ছিল তারা ফতোয়া ও শরিয়াহকে অবমূল্যায়ন করে বিদ্রোহ ঘোষণা করার পর। এমনকি সাম্প্রতিক অতীতে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করার বিষয়টিও ছিল দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই ও যথাযথ প্রক্রিয়ার ফসল। সেখানে কোনো উন্মত্ত মব বা বিশৃঙ্খলা করে কাউকে দমনের চেষ্টা করা হয়নি। সুতরাং বর্তমানের এই হঠাৎ গড়ে ওঠা মব সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণের বদলে কেবল অকল্যাণই বয়ে আনছে।

এই তৌহিদি জনতার ভেতরে কারা কাজ করছে, তা বিশ্লেষণ করলে এর বহুমাত্রিক চরিত্রটি ফুটে ওঠে। এতে যেমন দেওবন্দী, আহলে হাদিস কিংবা মওদুদী ঘরানার মানুষ আছে, তেমনি আছে সাধারণ জনতা, যারা সুফি ভাবধারার সাথে পরিচিত নয়। একটি ১২ জনের কাল্পনিক ‘মব’ দলের কথা ভাবলে এর জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়। সেখানে হয়তো ৫ জন থাকে আদর্শিক কট্টরপন্থী, ২ জন থাকে স্থানীয় সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, ২ জন কৌতূহলী উৎসুক জনতা, ২ জন সঠিক তথ্যের অভাবে বিভ্রান্ত তরুণ এবং অন্তত ১ জন থাকে যে কি না বিশৃঙ্খলার সুযোগে লুটতরাজ করতে চায়। এই যে উদ্দেশ্যের ভিন্নতা-কেউ হকের দাবি করছে, কেউ লোভে মগ্ন, কেউ স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত-তা থেকেই বোঝা যায় এই পরিধি কতটা বিস্তৃত।

আরও গভীরতর উদ্বেগের বিষয় হলো, এই জনগোষ্ঠীর ‘তৌহিদি’ নামকরণের পেছনে কোনো সূক্ষ্ম ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না। ইসলামি আকিদা অনুযায়ী কালিমা পূর্ণ হয় তৌহিদ ও রিসালাতের (আল্লাহ ও রাসূলের ওপর বিশ্বাস) সমন্বয়ে। কেবল ‘তৌহিদ’ শব্দটির ওপর অতি-গুরুত্বারোপ করে সুকৌশলে রিসালাতের আদর্শ তথা রাসূলের (সা.) রূহানি উত্তরাধিকারকে আড়াল করার কোনো বৈশ্বিক ছক কাজ করছে কি না, তা ভেবে দেখা জরুরি। সুপরিকল্পিতভাবে এই ‘সিস্টেমেটিক’ নামকরণের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে একটি অস্থির রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা থাকা অসম্ভব নয়। মিশর, ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত ও বিদেশি হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করতেই কি এই রূহানিয়্যাতহীন উগ্রবাদের চাষ করা হচ্ছে?

উত্তরণের পথ ও সমাধান

এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে উত্তরণে কেবল আবেগ নয়, বরং প্রজ্ঞা ও কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, আদর্শিক সংলাপের বিকল্প নেই। বিতর্কিত মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে সুফি-গবেষক এবং তৌহিদি ঘরানার শীর্ষ আলেমদের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে একটি প্রকাশ্য ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সংলাপে বসতে হবে। যেখানে দলিল ও যুক্তির মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা নির্ধারিত হবে, কোনো লাঠি বা আগুনের শক্তিতে নয়। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ধর্ম রক্ষার দোহাই দিয়ে কেউ যাতে ‘মব জাস্টিস’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। যেকোনো স্থাপনা বা মাজারে হামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন করতে হবে।

তৃতীয়ত, রূহানি ও নৈতিক জাগরণ। তরুণ প্রজন্মের কাছে ইসলামের প্রকৃত মরমী ও উদারপন্থী বার্তা পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তারা কোনো অদৃশ্য এজেন্ডার দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। চতুর্থত, সুফি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার। সুফি ঘরানাতেও যদি কোনো অনৈসলামিক বা অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে থাকে, তবে তা মব দিয়ে নয়, বরং পীর-মাশায়েখদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘রিফর্মিং কমিটি’র মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে। সর্বোপরি, বিভাজনের রাজনীতি রুখতে সাধারণ জনতাকে সচেতন করতে হবেÑযাতে বিদেশি কোনো শক্তি তৌহিদ বা ধর্মের নাম ব্যবহার করে আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে। সত্যের শক্তি থাকে শান্তিতে এবং ইনসাফে; উন্মত্ততায় নয়।

দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণ

বাংলাদেশের সুফি ও মরমী ঘরানা: একটি স্তরভিত্তিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে বর্তমানে যে বহুমাত্রিক সুফি ও মরমী ঘরানা বিদ্যমান, তাকে গভীর পর্যবেক্ষণে কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত করা যায়। এই বৈচিত্র্যের আড়ালে যেমন আধ্যাত্মিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে, তেমনি রয়েছে চরম আদর্শিক বিচ্যুতিও। প্রথম স্তরে দেখা যায় একদল বাউল বা মরমী সম্প্রদায়কে, যারা মূলত দেহতত্ত্ব বা লৌকিক মরমী সাধনা নিয়ে কাজ করে। তবে এদের অনেকের জীবনাচার ইসলামের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি অনেকটা পঞ্চম শ্রেণি পাস না করেই মাস্টার্স পাসের দাবি করার মতো। অর্থাৎ শরীয়তের বুনিয়াদি আমল যেমন-ঈমান, নামাজ, রোজা কিংবা শুদ্ধ ইসলামি জীবনযাপন বাদ দিয়েই তারা মারিফত বা আধ্যাত্মিকতার শিখরে পৌঁছাতে চায়। অথচ মারিফত হলো শরীয়তের ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা একটি অতিরিক্ত স্তর। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা থেকে সিলেটের মাজার জিয়ারতে গেলে কেউ চাইলে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করে সাদা পাথর ঘুরে আসতে পারে; কিন্তু সাদা পাথর দেখতে হলেও তাকে মূল সিলেট শহরটি অতিক্রম করতে হবে। তেমনিভাবে, বৈধ উপায়ে সন্তান লাভ করতে হলে যেমন বিয়ের বিকল্প নেই, মারিফতে প্রবেশ করতে হলেও শরীয়তের পূর্ণতা অপরিহার্য। ভিত্তিহীন ইমারত যেমন টেকে না, শরীয়তহীন মারিফতও তেমনি অন্তঃসারশূন্য।

দ্বিতীয় স্তরে এমন একদল ‘সুফি’র দেখা মেলে, যারা ‘দায়েমি সালাত’ বা ‘দমের জিকির’ বা ‘দম সাধন’ কিংবা কেবল ধ্যানের দোহাই দিয়ে প্রকাশ্যে শরীয়তকে অবজ্ঞা করে। এরা নামাজ-রোজার ধার ধারে না, উল্টো নিজেরাই সিজদা গ্রহণ করে এবং বাদ্যযন্ত্র ও নাচ-গানের আসর জমিয়ে আধ্যাত্মিকতার নামে উন্মাদনা তৈরি করে। এদের অনেকের মধ্যে বেপর্দা চলাফেরা, গাঁজা সেবন, লাল বা সাদা শালু পরিধান করে জটাধারী থাকা এবং গোঁফ-দাড়ি নিয়ে অনাচারী জীবন কাটানোর প্রবণতা দেখা যায়। এদের একটি অংশ আবার ‘সাধু সঙ্গের’ নামে বিয়ে ছাড়া নারী ভোগ কিংবা ভবঘুরে জীবনযাপনকে আধ্যাত্মিকতার অংশ মনে করে। লোকচক্ষুতে ফকিরি ভাব নিয়ে নিজেদের পীর বা ওলী দাবি করা এই গোষ্ঠীটিই মূলত সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে সুফিবাদের প্রতি ঘৃণা ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর মূল কারিগর। মূলত এদের কর্মকাণ্ডই ‘তৌহিদি জনতা’র মতো উগ্র মব তৈরির ইন্ধন হিসেবে কাজ করে।

তৃতীয় স্তরে রয়েছে একটি আধুনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক মাজারকেন্দ্রিক ঘরানা, যারা আধ্যাত্মিকতাকে স্রেফ ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে। এরা দরগাহ বা খানকাগুলোকে কেন্দ্র করে পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে পীর সেজে বসে থাকে এবং ভক্তদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিপুল অর্থ-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করে। এদের মধ্যে আধ্যাত্মিক সাধনার চেয়ে জাগতিক আধিপত্যের আকাক্সক্ষাই প্রবল, যা প্রকৃত সুফিবাদের মিতব্যয়িতা ও ত্যাগের দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

সর্বোপরি চতুর্থ স্তরে বিরাজ করছেন সেই সব মহানুভবরা, যারা প্রকৃত অর্থে কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যমতে আল্লাহর বন্ধু বা ‘আউলিয়া’। তাঁরা একাধারে আবেদ, আমলদার, মুত্তাকী এবং ফকিহ। তাঁদের পাণ্ডিত্য যেমন অগাধ, তেমনি তাঁদের জীবনও শরীয়তের কঠোর অনুশাসনে মোড়ানো। তাঁরা মুফাসসির, মুহাদ্দিস কিংবা আদেল বিচারক হিসেবে যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনি আধ্যাত্মিক সাধনায় তাঁরা প্রকৃত দরবেশ বা আল্লাহর ফকির। তাঁরা জীবনে এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা না করেও এবং শরীয়তের চুল পরিমাণ বিচ্যুতি না ঘটিয়ে মারিফতের চূড়ান্ত মাকাম হাসিল করেছেন। প্রকৃত সুফিবাদ মূলত এভাবেই টিকে আছে-যেখানে শরীয়ত ও মারিফত পরস্পর পরিপূরক। এই শ্রেণিবিন্যাসটি অনুধাবন করা জরুরি এজন্য যে, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির ভুলের দায় যাতে প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণির ওপর না পড়ে। সমাজ থেকে উগ্রবাদ দূর করতে হলে যেমন মব-সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে, তেমনি সুফিবাদের নামে প্রচলিত এই অনাচার ও ব্যবসায়িক লালসাও কঠোরভাবে রোধ করা প্রয়োজন। একমাত্র সত্যকার শরিয়তপন্থী আধ্যাত্মিক সাধনাই পারে মানুষের রূহানি মুক্তি নিশ্চিত করতে এবং সামাজিকভাবে ইসলামের প্রকৃত শান্তিবাদী ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে।

তৃতীয় পর্যবেক্ষণ

বাংলাদেশে মাজার সংস্কৃতি: বৈচিত্র্য, বিতর্ক ও বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে মাজার সংস্কৃতি এক বৈচিত্র্যময় ও বহুমাত্রিক রূপ পরিগ্রহ করেছে, যেখানে ধর্মীয় ভক্তি, আধ্যাত্মিক প্রভাব এবং লৌকিক আচারের এক জটিল মিশ্রণ বিদ্যমান। এই সংস্কৃতিকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, কিছু মাজার স্থাপত্যশৈলীতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ-যেখানে কবরগুলো বেশ উঁচু, উপরে লাল, সবুজ বা হরেক রঙের গিলাফ চড়ানো এবং কারুকার্যমণ্ডিত গম্বুজের নিচে অবস্থিত। কোনো কোনো মাজারে মৃত ব্যক্তির ব্যবহৃত চেয়ার বা হুক্কা সযত্নে রাখা হয় এবং বিশ্বাসী অনুসারীরা প্রথা মেনে তাতে তামাক-পানিও সরবরাহ করে। সুগন্ধি আতর ও গোলাপজল ছিটানো, কবর ছুঁয়ে সালাম করা কিংবা সরাসরি কবরে সেজদা দেওয়ার মতো দৃশ্যও সেখানে সুলভ। অনেক মাজারে হারমোনিয়াম-তবলা সহযোগে ভেতরে বা বাইরের মাঠে সামা ও কাওয়ালির আসর বসে, যেখানে নর-নারী নির্বিশেষে তথাকথিত সুফি নৃত্যে অংশ নেয়। মাজার ধোয়া পানিকে ‘রোগমুক্তি’ মনে করে পান করা, কবরের ওপর টাকা ছিটানো এবং মানত পূরণের আশায় রেশমি সুতা বা তালা বেঁধে রাখার মতো বিচিত্র লৌকিক প্রথাও সেখানে বিদ্যমান। অধিকাংশ মাজারেই দানবক্স থাকে এবং একদল খাদেম ঝাড়ফুঁক, দোয়া কিংবা তাবিজ দেওয়ার মাধ্যমে এক ধরনের মাজার-কেন্দ্রিক অর্থব্যবস্থা বা ব্যবসায়িক কাঠামো পরিচালনা করে।

বিপরীত দিকে, মাজারের ভৌত কাঠামো এবং প্রচারের ধরনেও রয়েছে বিস্তর ভিন্নতা। অনেক মাজার বা রওজা এমন রয়েছে যেখানে কোনো নামফলক বা পরিচিতি ফলক নেই; এই নামহীনতা যেমন অতি-নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ সাধকদের বিনয়ের পরিচয় দেয়, তেমনি অনেক সময় এগুলো ‘গায়েবি মাজার’ হিসেবে লৌকিক রহস্যের জন্ম দেয়। স্থাপত্যের বিচারে কিছু মাজারের ওপর কোনো ছাদ নেই, যা খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়। আবার কিছু মাজার সাধারণ কবরস্থানের মতো সাদামাটা; কিছু ক্ষেত্রে মসজিদ সংলগ্ন স্থাপনায় কবর থাকলেও কবরের ঠিক ওপরের অংশটি উন্মুক্ত রাখা হয় যাতে সরাসরি বৃষ্টির পানি সেখানে পড়ে রূহানি সিক্ততা বজায় রাখে। অনেক মাজারে আবার নেই কোনো খাদেমের দাপট, নেই সিজদা বা গিলাফের বালাই; কেবল ধূপ-আগরবাতি বা মোমবাতি জ্বালিয়ে অত্যন্ত অনাড়ম্বরভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

প্রকৃতপক্ষে, মাজার বা কবরের মূল উদ্দেশ্য হলো আখেরাত এবং অনিবার্য মৃত্যুকে স্মরণ করা। আতর বিক্রেতার পাশ দিয়ে চললে যেমন আতরের খুশবু পাওয়া যায়, তেমনি কুরআন যাকে ‘ওলী’ বা আল্লাহর বন্ধু বলেছে, সেই সব আল্লাহওয়ালাদের কবরের পাশে বসলে, দাঁড়ালে বা মোরাক্বাবা করলে রূহ বা আত্মায় এক অনাবিল প্রশান্তি ও রূহানি প্রভাব অনুভূত হয়। তবে সব মাজারের প্রভাব এক নয়; কিছু মাজারের পাশে দাঁড়ালে আধ্যাত্মিক স্পন্দন অনুভূত হলেও অনেক মাজার আজ শিরক ও বিদআতের আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যেখানে ইসলামের মূল শিক্ষার বিপরীতে মৃত ব্যক্তিকে অতিমানবে রূপান্তর করা হয়। প্রকারভেদ বিচারে আরও দেখা যায়, কিছু মাজার ‘খানকা’ ভিত্তিক যেখানে বিশুদ্ধ জিকির ও তাসাউউফ চর্চা হয়, আবার কিছু মাজার কেবল ‘ওরস’ বা মেলা কেন্দ্রিক যেখানে আধ্যাত্মিকতার চেয়ে লৌকিক উৎসব ও ব্যবসার প্রাধান্য বেশি। মূলত মাজার কেন্দ্রিক এই সংস্কৃতি আজ দুটি স্পষ্ট ধারায় বিভক্ত-একদিকে আধ্যাত্মিকতার আবরণে ব্যবসায়িক ও লৌকিক আচারের দাপট, অন্যদিকে নিভৃতচারী প্রকৃত সুফিদের সুন্নাহসম্মত নির্জন স্মৃতি, যা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে এবং মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দিতে সহায়তা করে। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতে না পারার কারণেই বর্তমান সমাজে মাজার ও সুফিবাদকে কেন্দ্র করে উগ্রবাদী মব বা চরম আদর্শিক সংঘাতের পথ প্রশস্ত হচ্ছে।

সমন্বিত পর্যালোচনা ও উপসংহার

উপরের তিনটি স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ একত্রে পাঠ করলে একটি দুষ্টচক্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাজারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধারার অনাচার-কবরে সেজদা, গাঁজা সেবন, বেপর্দা নৃত্যের আসর-সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ক্রোধ ও বিভ্রান্তি তৈরি করে। সেই ক্রোধকে পুঁজি করে সংগঠিত হয় তৌহিদি মব, যে মব সুফিবাদের নামে প্রচলিত সব কিছুকেই একসাথে নিশানা করে। ফলে প্রকৃত সুফিরাও আক্রান্ত হন, বৈধ মাজারও ভাঙচুরের শিকার হয়। এই ভাঙচুর আবার নতুন উত্তেজনা ও মেরুকরণ তৈরি করে-এবং চক্রটি চলতে থাকে। এই চক্রের সুবিধাভোগী ধর্মপ্রাণ মুসলমান নয়, প্রকৃত সুফি সাধক নয়-বরং সেই শক্তি যারা মুসলিম উম্মাহর ভেতরে বিভাজন ঘটিয়ে বাংলাদেশকে একটি দুর্বল ও অস্থির রাষ্ট্র হিসেবে দেখাতে চায়। শরিয়তের ভিত্তিহীন মারিফত যেমন অন্তঃসারশূন্য, তেমনি মারিফতহীন শুষ্ক শরিয়তও রূহানি পরিপূর্ণতা দিতে পারে না। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের সুফিদের অনাচারের দায় চতুর্থ স্তরের প্রকৃত আউলিয়াদের ওপর বর্তায় না। আর সেই অনাচারের প্রতিবাদ যদি হয় মবের মাধ্যমে, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না-বরং নতুন সমস্যার জন্ম হয় এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা জাতি। সত্যের শক্তি থাকে শান্তিতে ও ইনসাফে-উন্মত্ততায় নয়, উন্মাদনায় নয়।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  তৌহিদি জনতা   মব-সংস্কৃতি   মাজার বিতর্ক  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close