বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
শিরোনাম: যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা      নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে সতর্কবার্তা আলজেরিয়ার      হিজবুল্লাহর হামলা বন্ধের শর্তে লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে রাজি ইসরায়েল      গণঅভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আ. লীগের আপত্তি, পাল্টা জবাব জাতিসংঘের      দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে মেতেছে একটি দল : মির্জা ফখরুল      মায়ের গলিত লাশ উদ্ধার : যুগ্ম সচিব ছেলেকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার      আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
চা-শিল্প : সবুজের আড়ালে শ্রমদাসত্ব
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ১:১৭ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

বাংলাদেশের চা-বাগান মানেই সবুজের অপার সৌন্দর্য, পাহাড়ি ঢালু জমির নান্দনিক বিন্যাস এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য দৃশ্যপট। পর্যটন, রপ্তানি আয় এবং ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে চা-শিল্পকে আমরা যতটা উদযাপন করি, ততটাই উপেক্ষিত থাকে এর ভেতরের বাস্তবতা। একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, যেখানে শ্রমিকরা আজও ন্যূনতম মানবিক মর্যাদার বাইরে অবস্থান করছে। 

দেশের ১৭২টি চা-বাগানে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার শ্রমিক সরাসরি কর্মরত। পরিবারসহ এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। নারী শ্রমিকের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি এসব শ্রমিক হলেও তাদের জীবনে উন্নয়নের ছোঁয়া খুবই সীমিত। মজুরি, ভূমির অধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা কাঠামোগত বঞ্চনার শিকার। 
বাংলাদেশে চা-শিল্পের সূচনা ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে মূলত মুনাফা-কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক স্বার্থে এই শিল্পের বিকাশ ঘটে। তখন শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল-বিহার, মাদ্রাজ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রলোভন, প্রতারণা এবং অনেক ক্ষেত্রে জোরপূর্বক ধরে এনে চা-বাগানে কাজ করানো হতো। এই শ্রমিক সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় ‘আড়কাঠি’ ও ‘গিরমিট’ প্রথা চালু ছিল, যার মাধ্যমে শ্রমিকদের কার্যত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আবদ্ধ করে রাখা হতো। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা দাসপ্রথার আধুনিক রূপ হিসেবেই বিবেচিত। শ্রমিকরা বাগানের বাইরে যেতে পারতেন না, চাকরি পরিবর্তনের স্বাধীনতা ছিল না, এমনকি পালানোর চেষ্টা করলে কঠোর শাস্তি পেতে হতো।

ঔপনিবেশিক কাঠামো শুধু ইতিহাস নয়; এর প্রভাব আজও চা-শ্রমিকদের জীবন বাস্তবতায় গভীরভাবে বিদ্যমান। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তন হলেও শ্রমিকদের অবস্থানের মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। চা-বাগান গড়ে উঠেছে শ্রমিকদের শ্রম, ঘাম এবং জীবনের বিনিময়ে। পাহাড়-জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে বন্য প্রাণীর আক্রমণ, বিষাক্ত সাপের কামড়, রোগব্যাধি এবং দুর্ঘটনায় অসংখ্য শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। 

এই শিল্পের পেছনে রয়েছে এক নীরব মৃত্যুচক্র। ১৯২১ সালে প্রায় ১২ হাজার চা-শ্রমিক তাদের জন্মভূমিতে ফেরার উদ্দেশ্যে চাঁদপুরে সমবেত হন। কিন্তু সেখানে প্রশাসনিক বাধা, বিশৃঙ্খলা এবং পরবর্তীতে গুলিবর্ষণ ও রোগব্যাধির কারণে শত শত শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনাটি চা-শ্রমিকদের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা তাদের আন্দোলনকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দিলেও শোষণের বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। চা-শ্রমিকদের বর্তমান দৈনিক মজুরি প্রায় ১৮৭ টাকা। বর্তমান বাজারমূল্যে এটি একটি পরিবারের ন্যূনতম জীবনধারণের জন্যও যথেষ্ট নয়। খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও আবাসনের ব্যয় বিবেচনায় এ মজুরি কার্যত ‘আধা-মানুষ’ হয়ে বেঁচে থাকার সমান।

শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি, দৈনিক অন্তত ১০০০ টাকা মজুরি এবং পূর্ণাঙ্গ রেশন ব্যবস্থা। এটি কোনো অতিরিক্ত দাবি নয়; বরং মৌলিক মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার ন্যূনতম শর্ত। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে চা-শ্রমিকদের মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে চা-শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলকভাবে বেশি এবং জীবনমান উন্নত। চা-শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো ভূমির মালিকানার অভাব। প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই বাগানে বসবাস করলেও তারা কোনো আইনি মালিকানা পাননি। তারা কেবল ‘অনুমতিপ্রাপ্ত বাসিন্দা’। ভূমির দলিল না থাকায় তারা ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করতে পারেন না, সম্পদ গড়ে তুলতে পারেন না এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকেন। 

ফলে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হওয়া তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। চা-বাগানের শ্রমিকরা দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্য পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করেন। যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সারের উচ্চ হার উদ্বেগজনক। নারী শ্রমিকদের মধ্যে জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি বিশেষভাবে বেশি। অপুষ্টি, অপরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতি এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অনেক ক্ষেত্রে অসুস্থ হলেও শ্রমিকরা চিকিৎসা নিতে যান না, কারণ এতে তাদের দৈনিক আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

সরকারি নীতিতে স্বাস্থ্যসেবার কথা থাকলেও বাস্তবে চা-বাগানের ক্লিনিক ও চিকিৎসা ব্যবস্থার কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত। শিক্ষার ক্ষেত্রেও চা-বাগানের অবস্থা উদ্বেগজনক। জাতীয় গড়ের তুলনায় এখানে শিক্ষার হার কম। দারিদ্র্য, সচেতনতার অভাব এবং পারিবারিক চাপে অনেক শিশু অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হয়। ফলে একটি প্রজন্ম শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি প্রজন্মগত সামাজিক সংকট। 

চা-শিল্পে নারী শ্রমিকরা সংখ্যায় বেশি হলেও তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন এবং নিরাপত্তাহীনতা একটি বাস্তব সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার কোনো বিচার হয় না। অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং সামাজিক সীমাবদ্ধতা তাদের এই অবস্থায় আটকে রাখে। ফলে তারা একদিকে শ্রমিক, অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার, এই দ্বৈত বাস্তবতায় জীবনযাপন করেন। চা-শ্রমিকদের মধ্যে খাড়িয়া, মুন্ডারি, সাঁওতালসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। কিন্তু এসব ভাষার অনেকগুলোই আজ বিলুপ্তির পথে। 

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাবে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। ফলে একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। চা-বাগানের জমি ব্যবহার করে রিসোর্ট, ট্যুরিজম এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে উঠছে। এতে একদিকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়লেও অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবিকা ও কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে। এই উন্নয়ন প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং তাদের অস্তিত্বকেই নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। 

চা-শ্রমিকদের সংকট সমাধানে প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। এর মধ্যে রয়েছে জীবনধারণযোগ্য মজুরি নির্ধারণ; ভূমির মালিকানা বা দীর্ঘমেয়াদি পাট্টা প্রদান; স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন; শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষা; নারী ও শিশু সুরক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ; শ্রমিক ইউনিয়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

চা-শ্রমিকদের জীবন কেবল একটি অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং উন্নয়ন দর্শনের প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র তখনই উন্নত বলা যায়, যখন তার সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হয়। সবুজের এই সৌন্দর্যের আড়ালে যে দীর্ঘশ্বাস জমে আছে, তা আর উপেক্ষা করা যায় না। উন্নয়নের গল্প তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন চা-বাগানের শ্রমিকরাও সেই গল্পের অংশ হতে পারবেন- মালিকানায়, মর্যাদায় এবং মানবিক অধিকারে। রাষ্ট্র কি এবার সেই কণ্ঠস্বর শুনবে? নাকি ইতিহাস আবারও নীরব বঞ্চনার সাক্ষী হয়ে থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের কাছেই ছেড়ে দিতে হয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  চা-শিল্প   সবুজের আড়ালে শ্রমদাসত্ব  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close