ঢাকার মিরপুরের একটি বহুতল ভবনের বন্ধ ফ্ল্যাট থেকে যখন পঁচাত্তর বছর বয়সী এক মায়ের গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হলো, তখন তা কেবল একটি মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল আমাদের চকমকে নাগরিক সভ্যতার কঙ্কালসার রূপের উন্মোচন। দরজার আড়ালে গুমরে মরা এক মায়ের শেষ নিঃশ্বাসের গল্প আজ আমাদের এমন এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যা খবরের কাগজের পাতা ছাড়িয়ে প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়।
শহরের একটি ফ্লাটে ওই বৃদ্ধা মা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিলেন, তখন তার উচ্চশিক্ষিত ও সচ্ছল সন্তানরা হয়তো ব্যস্ত ছিলেন নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত জীবনের হিসাব-নিকাশে। এই নির্মম চিত্রটি খুব বেশি অবাক হবার কিছু নেই। পশ্চিমা শিক্ষা হয়তো আমাদের সন্তানদের ক্যালিফোর্নিয়া বা লন্ডনের কর্পোরেট অফিসে জায়গা করে দিতে পেরেছে, কিন্তু মায়ের জীর্ণ ঘরের অন্ধকার দূর করার মানবিক আলো দিতে পারেনি। এই ট্র্যাজেডির গভীরে তাকালে যে সত্যটি সবচেয়ে তীব্রভাবে ধরা পড়ে, তা হলো চরম অবহেলা, সন্তানদের স্কুলিং করতে আমরা প্রায়শই ভুল করে থাকি।
যে মা নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, শ্রম ও স্বপ্ন বাজি রেখে সন্তানদের মানুষ করেছিলেন, শেষ বয়সে এসে তার ভাগ্যে এক ফোঁটা জল বা এক মুঠো অন্ন দেওয়ার মতো কেউ ছিল না, যা সভ্য সমাজের চরম অমানবিকতার বহিঃপ্রকাশ। যখন একটি সমাজে বৃদ্ধ পিতা-মাতার স্থান সন্তানের ড্রয়িংরুম ছেড়ে ঘরের কোণের অন্ধকার কিংবা কোনো জীর্ণ কোণে হয়, তখন বুঝতে হবে- সে সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে।
পুঁজিবাদী এই নগর জীবনে একান্নবর্তী পরিবারের ধারণা আজ ডাইনোসরের মতো বিলুপ্তপ্রায়, যার স্থান দখল করেছে চরম পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা। প্রত্যেকে নিজ নিজ ছোট ফ্ল্যাটে, নিজেদের সাজানো গোছানো ক্যারিয়ারের বৃত্তে এমনভাবে বন্দি হয়ে পড়েছে যে, রক্তের সম্পর্কের টানগুলোও আজ যান্ত্রিকতার চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে। এই বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন প্রবীণরা, যাদের জীবনে গ্রাস করছে এক ভয়ানক নিঃসঙ্গতা বৃদ্ধি। চারদিকের এত কোলাহল, এত আলোর ঝলকানির মাঝেও একেকজন বৃদ্ধ মানুষ ঘরের এক কোণে বসে শুধু ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দ শোনেন আর অপেক্ষা করেন- কখনো কি একটিবারের জন্য ফোনটা বেজে উঠবে?
এই নির্মম ট্র্যাজেডি আমাদের সমাজকে এক বিরাট সামাজিক দায়িত্বহীনতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা নিজেরা ভালো থাকার অন্ধ দৌড়ে এতটাই মত্ত যে, আমাদের পাশে, আমাদের চেনা জানা পরিবারগুলোতে কী ঘটছে, কোন মা তীব্র কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, সেই খবর রাখার ন্যূনতম তাগিদটুকুও অনুভব করি না। আজকের দিনে এই ঘটনাটি আমাদের প্রচলিত উচ্চশিক্ষাকে বড় ধরনের একটি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে শিক্ষা সন্তানকে স্বাবলম্বী করে কিন্তু নিজের জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ শেখায় না, সেই শিক্ষার উপযোগিতা কোথায় এবং তা আদৌ কোনো আলো ছড়াচ্ছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
আসলে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির পেছনে ছুটতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছি আদি ও অকৃত্রিম মানবিক মূল্যবোধ। সহানুভূতি, দয়া, পরোপকার আর প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের মতো মৌলিক গুণগুলো আজ আমাদের জীবন থেকে কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে, যার ফলে সমাজটা হয়ে উঠছে এক টুকরো মরুভূমি। মায়ের মরদেহ দিনের পর দিন ঘরের ভেতর পচে-গলে যাওয়া এবং সন্তানদের সেই খবর না রাখা বা রেখেও উদাসীন থাকা এক ধরনের চরম মানসিক বিকারগ্রস্ততার লক্ষণ। এটি কোনো সুস্থ মানুষের আচরণ হতে পারে না, বরং এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পঙ্গুত্ব যা আমাদের তরুণ ও মধ্যবয়সী প্রজন্মকে ভেতরে ভেতরে গ্রাস করে ফেলছে।
এই জনাকীর্ণ ঢাকা শহরে কত মানুষ ফুটপাতে ঘুমাচ্ছে, কত মানুষ মিছিলে যাচ্ছে, অথচ একজন মা নিজের ফ্ল্যাটে নীরবে-নিভৃতে এক নিঃসঙ্গ মৃত্যুর শিকার হলেন। মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে তিনি যখন তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তখন হয়তো ভাঙা গলায় শেষবারের মতো সন্তানদের নাম ধরে ডেকেছিলেন, কিন্তু সেই ডাক পৌঁছায়নি কারও কানে।
এ ঘটনা প্রতিবেশীদের উদাসীনতাকেও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। দেয়ালের ওপাশে একজন বৃদ্ধা দিনের পর দিন নিখোঁজ, ঘরের ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে, অথচ পাশের ফ্ল্যাটের আধুনিক মানুষগুলো নিজেদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খোঁজই নেয়নি।
অনেকে হয়তো ভাবেন, সন্তানদের সময় না থাকলে অবহেলিত বৃদ্ধাশ্রম তো আছেই, কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বৃদ্ধাশ্রমগুলো আজ প্রবীণদের নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার চেয়ে এক ধরনের নির্বাসন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সন্তানরা সেখানে টাকা পাঠিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করে, কিন্তু বৃদ্ধ হৃদয়ের ভালোবাসার ক্ষুধা কি টাকা দিয়ে মেটানো সম্ভব?
আজ আমাদের পারিবারিক বন্ধনগুলো এতটাই ঠুনকো হয়ে গেছে যে, সামান্য স্বার্থ বা দূরত্বের কারণে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। যে পারিবারিক আবহ একসময় আমাদের পরম মমতায় আগলে রাখত, আজ তা কেবলই আনুষ্ঠানিকতা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কৃত্রিম ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে পড়েছে। এ ধরনের সামাজিক অপরাধ ও অবহেলার পেছনে আইনের শাসনের দুর্বলতাও বহুলাংশে দায়ী। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন কাগজে-কলমে থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগ ও তদারকি না থাকায় অপরাধী সন্তানরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যা সমাজকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে।
পাশাপাশি, আমাদের নিথর প্রশাসনও এই দায় এড়াতে পারে না; স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের এমন কোনো কার্যকর ডেটাবেজ বা নজরদারি ব্যবস্থা নেই যা দিয়ে একা থাকা প্রবীণদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ নেওয়া যায়।
এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে হলে আমাদের পরিবার ও সমাজে সচেতনতার অভাব দূর করা জরুরি। প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি ভবনে প্রবীণদের কল্যাণে সামাজিক কমিটি গঠন করতে হবে এবং সন্তানদের বোঝাতে হবে যে, আজকের অবহেলার বীজ আগামী দিনে তাদের নিজেদের জীবনেই বিষবৃক্ষ হয়ে ফিরে আসবে। সর্বোপরি, আমাদের জীবনে ধর্মীয় অনুশাসনের চর্চা ফিরিয়ে আনা একান্ত প্রয়োজন, কারণ প্রতিটি ধর্মই পিতা-মাতার সেবা করাকে সর্বোচ্চ ইবাদত বা পুণ্য হিসেবে গণ্য করেছে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার এই মেলবন্ধনেই কেবল পারে আমাদের এই আত্মকেন্দ্রিক জীবন ও চরম অমানবিকতার অবসান ঘটিয়ে একটি সুস্থ, সুন্দর ও মমতাময় সমাজ বিনির্মাণ করতে, যেখানে আর কোনো মায়ের লাশ এভাবে পচে-গলে পড়ে থাকবে না।
কেকে/এমএ