# হুমকির মুখে পরিবেশ
# সড়ক-সেতু-কালভার্ট ঝুঁকিতে
# সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব
পাহাড়ি ছড়া বেষ্টিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, রাজনগর এবং কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন নদী ও ছড়া থেকে অবৈধভাবে অবাধে তোলা হচ্ছে বালু। সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। এতে হুমকির মুখে পরিবেশ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় অবকাঠমো, ফসলের জমি ও বসতবাড়ি। বালুবাহী ট্রাকে একের পর দুর্ঘটনাসহ ঘটছে প্রাণহানীর ঘটনা।
গত রোববার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর চৌমুহনা (সরকার বাজার) এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে সিএনজি ও ইজিবাইক মুখামুখি সংঘর্ষে ছয় জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শিপন ও রাসেল নামে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বর্তমানে একজন সিলেট এবং অন্যজন ঢাকায় চিকিৎসাীন রয়েছেন। আহত অন্যরা সিলেট উসমানী মেডিকেল কলেজ ও মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর আগেও শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর এলাকায় বালুবাহী ট্রাকে স্কুল শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাসহ একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর, সিন্দুরখান, আশিদ্রোন, সদর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের ছড়া থেকে অবৈধভাবে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে। একই চিত্র কমলগঞ্জ, রাজনগর এবং কুলাউড়া উপজেলার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের ছয়ঘড়ি এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ভেকু মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে প্রাকৃতিক টিলার লাল মাটি কেটে সমতলে পরিণত করছেন। অপরদিকে একই উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের সুনছড়া চা-বাগানসংলগ্ন টিলাভূমি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র টিলা ও পাহাড়ি ছড়ার বাঁধ কেটে সিলিকা বালু উত্তোলন করে আসছে। উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর এলাকায় ধলাই নদের ওপর স্টিল সেতুর নিচ থেকে অবাধে পলিমাটি কেটে ট্রাকযোগে স্থানান্তর করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা দীর্ঘদিন ধরে নদীর বাঁধ ও সেতুর নিচ থেকে মাটি উত্তোলন করে নিচ্ছে। ফলে সেতুটি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় টিলা কাটা, পাহাড়ি ছড়া ও ছড়ার পার্শ্ববর্তী স্থান কেটে সিলিকা বালু উত্তোলন করে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। ট্রাক, পিকআপ ও ট্রলিযোগে এই সিলিকা বালু পরিবহন ও বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। কলেজশিক্ষক জমশেদ আলী, পেশাজীবী সোলেমান মিয়া, চা-শ্রমিক নেতা সীতারাম বীনসহ অনেকেই বলেন, প্রশাসনের অবহেলার কারণে উপজেলার প্রাকৃতিক অনেক দর্শনীয় স্থান নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ছে। এতে পরিবেশ ও আশপাশের রাস্তঘাট, কৃষিজমি, সেতু-কালভার্ট হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
কমলগঞ্জ ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান বলেন, টিলা কাটাসগ সেতুর নিচ থেকে মাটি কাটা ও সুনছড়া থেকে সিলিকা বালু উত্তোলন বিষয়ে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এদিকে কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে ‘বড়ছড়া’ থেকে সরকারিভাবে ইজারা বন্ধ থাকার পরও স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট চক্র রাতের আধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে স্থানীয় পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জনজীবন হুমকির মুখে রয়েছে।
পরিবেশ কর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, মৌলভীবাজারে প্রায় অর্ধশতাধিক ছড়া রয়েছে। এসব ছড়া ইজারা না থাকায় নিয়মিত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব বালু মহাল নিয়মিত ইজারা দেওয়া হলে সরকার প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করতো। তবে সরকার ইজারা না দিয়ে বালু লুট করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে রাজিব উদ্দিন বলেন, অতীতে এই বড়ছড়া থেকে আ.লীগের স্থানীয় শীর্ষ নেতারা অবাধে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করেছেন। আমি বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নই।
বরমচাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খোরশেদ আহমদ খান সুইট বলেন, অতীতে এই বড়ছড়া থেকে একাধিকবার বালু জব্দ করিয়েছি কিন্তু পরে জব্দকৃত বালুও লুট হয়ে যায়। বর্তমানে রাতের আধারে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট চক্র বড়ছড়া থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
কুলাউড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আনিছুল ইসলাম বলেন, বড়ছড়া থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি স্থানীয় লোকজন আমাদের জানিয়েছেন। খুব শীঘ্রই অভিযান চালিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ইউএনও জিয়াউর রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে পাওয়া অভিযুক্তদের জরিমানাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। পরিবেশ-প্রতিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড মেনে নেয়া যাবে না। অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িতদের শনাক্ত করে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
কেকে/এজে