কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে তিতাস গ্যাসের উচ্চচাপের প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে গড়ে তোলা একটি চুনাপাথর কারখানায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুর ১টার দিকে উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজীরচর গ্রামে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে কারখানার তিনটি চুল্লি ভেঙে ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে কারখানায় মজুত করে রাখা চুনাপাথর ও চুল্লি নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত ইট জব্দ করা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাবনী আক্তার তারানার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে উপস্থিত ছিলেন তিতাস গ্যাসের ময়মনসিংহ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (আঞ্চলিক অপারেশন) প্রকৌশলী সুমেধ মনি চাকমা, ব্যবস্থাপক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মো. শামীম হোসেন এবং কিশোরগঞ্জ জোনাল অফিসের ম্যানেজার মো. মোশাররফ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উপজেলা প্রশাসন ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, কাজীরচর এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশ দিয়ে নরসিংদী থেকে কিশোরগঞ্জে গ্যাস সরবরাহের জন্য তিতাস গ্যাসের উচ্চচাপের প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইন রয়েছে। ওই পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নিয়ে চুনাপাথর পোড়ানোর কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য নদীর তীরবর্তী এলাকায় কারখানার অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় এবং তিনটি চুল্লিও তৈরি করা হয়েছিল।
তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার সময় পাইপলাইনে লিকেজ সৃষ্টি হয়। এতে উচ্চচাপের গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে নদীর পানিতে অস্বাভাবিকভাবে বুদবুদ দেখা দিতে থাকলে স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। প্রথম দিকে অনেকে এটিকে পানির স্বাভাবিক গতিবিধি মনে করলেও পরবর্তী সময়ে বুদবুদের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় কয়েকজন বিষয়টি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে জানালে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের ধারণা, প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা করার সময়ই পাইপলাইনে ছিদ্র বা লিকেজ সৃষ্টি হয়েছে। এরপর থেকেই পাইপলাইন দিয়ে গ্যাস বের হয়ে আসছে।
ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসন ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার সেখানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে কারখানার তিনটি চুল্লি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়, যাতে ভবিষ্যতে ওই স্থাপনা ব্যবহার করে চুনাপাথর পোড়ানোর কার্যক্রম চালু করা না যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশ দিয়ে যাওয়া নরসিংদী-কিশোরগঞ্জ গ্যাস সরবরাহের উচ্চচাপের প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইনের একটি অংশ দিয়ে এখনও গ্যাস নির্গত হচ্ছে। পানির নিচ থেকে একটানা বুদবুদ উঠে পানির ওপরিভাগে ছড়িয়ে পড়ছে। এ সময় নদীর তীরবর্তী এলাকায় স্থানীয় মানুষের উপস্থিতিও দেখা যায়।
স্থানীয়রা জানান, প্রথম দিকে পানিতে বুদবুদ ওঠার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুদবুদের পরিমাণ বাড়তে থাকলে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা শুরু হয়। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে খবর পৌঁছালে বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ধারণা, উচ্চচাপের প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস চুরি করে নদীর পাশে নির্মাণাধীন চুনাপাথর কারখানায় নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ সময় পাইপলাইনে লিকেজ সৃষ্টি হওয়ায় গ্যাস বের হয়ে আসছে। লিকেজ শনাক্ত ও তা বন্ধ করার জন্য তিতাস গ্যাসের কর্মীরা কাজ করছেন।
এদিকে উচ্চচাপের পাইপলাইনে লিকেজের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস বের হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নদীর তীরবর্তী এলাকায় গ্যাসের উপস্থিতি থাকায় দ্রুত লিকেজ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কারখানাটি স্থাপনের আগে তাঁর কাছ থেকে কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়নি। এমনকি কারখানা স্থাপনের বিষয়েও তাঁকে অবহিত করা হয়নি। গ্যাস লিকেজের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারেন, সেখানে একটি অবৈধ চুনাপাথর কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা কীভাবে করা হলো, সেটিও তদন্ত করে দেখা দরকার।
অভিযান শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাবনী আক্তার তারানা বলেন, অবৈধভাবে একটি চুনাপাথর কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে কারখানাটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। সেখানে তিনটি চুল্লি নির্মাণের পাশাপাশি চুনাপাথর মজুত করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল তিতাস গ্যাসের প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নিয়ে কারখানাটি পরিচালনা করা।
তিনি বলেন, গ্যাসের অবৈধ সংযোগ নেওয়ার সময়ই পাইপলাইনে লিকেজ সৃষ্টি হয় এবং সেখান থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। ভবিষ্যতে যাতে কারখানাটি পুনরায় চালু করা না যায়, সে জন্য তিনটি চুল্লিই সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অভিযানে জব্দ করা চুনাপাথর ও চুল্লি নির্মাণে ব্যবহৃত ইট স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের জিম্মায় রাখা হয়েছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লাবনী আক্তার তারানা আরও বলেন, এ ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজনের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। জমির মালিক অবৈধভাবে কারখানা স্থাপনের জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে জমি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে কারখানাটির কোনো বৈধ অনুমোদন বা লাইসেন্স ছিল না। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষও এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, অভিযানের সময় কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে সেখানে থাকা বিভিন্ন মালামালের পরিমাণ নির্ধারণ করে সেগুলো চেয়ারম্যানের জিম্মায় দিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে সেগুলো সেভাবেই রয়েছে। তবে কীভাবে গ্যাসের ছিদ্র বা লিকেজ হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তীতে জানা যাবে।
কেকে/ এমএস