দিনাজপুরে পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুক, মানসিক ও শারীরিক সহিংসতার শিকার নারীদের আইনি সহায়তার পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘পল্লীশ্রী’। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং প্রারম্ভিক পুঁজি সহায়তার মাধ্যমে নির্যাতিত নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি।
পল্লীশ্রীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সংস্থাটি মোট ৮৪৭ জন নির্যাতনের শিকার নারীর সঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্যে ৭৩৫টি অভিযোগ সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। একইসঙ্গে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে কম্পিউটার, সেলাই, বুটিকস, ব্যাগ তৈরি, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এমনই একজন স্বপ্না। ২০২২ সালে বিয়ের সময় তার পরিবার ছয় লাখ টাকা যৌতুক দিলেও বিয়ের এক বছর পর স্বামী আরও যৌতুক দাবি করেন। পরিবারের অপারগতায় তার ওপর শুরু হয় নির্যাতন। একাধিকবার সালিশ ও আইনি সহায়তা নেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ২০২৪ সালে তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি কম্পিউটার গ্রাফিক্স প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের ও মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন।
রোখসানা খাতুনও একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার। ২০২০ সালে বিয়ের পর কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ায় এবং শিশুর গায়ের রং শ্যামলা হওয়াকে কেন্দ্র করে তাকে নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়। পরবর্তীতে স্বামী তাকে তালাক দেন। বর্তমানে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি বাড়িতে কাজ করে নিজের ও সন্তানের ব্যয় নির্বাহ করছেন।
দিনাজপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ও পল্লীশ্রীর তথ্য বলছে, জেলায় প্রতিদিন গড়ে দুইজনের বেশি নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের হয়েছে ৮১৪টি। এর আগে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৯ এবং ২০২৩ সালে ১ হাজার ৩৬৩।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা, আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নারী নির্যাতনের প্রবণতা এখনও উদ্বেগজনক।
পল্লীশ্রীর কর্মকর্তাদের মতে, নির্যাতনের ঘটনার সমাধানের পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারীদের সম্মানজনক জীবনযাপন ও সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তোলা জরুরি। এ লক্ষ্যেই সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৯৭ জন নির্যাতনের শিকার নারীর সঙ্গে কাজ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ৩৩ জন, যৌতুকের জন্য নির্যাতিত ১৫ জন এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২৯ জন। এছাড়া জমিজমা বিরোধ, মানসিক নির্যাতন, বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, যৌন হয়রানি ও পরকীয়াজনিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরও ২০ জন নারী। একই সময়ে ১১৫ জন নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছে পল্লীশ্রী। তাদের মধ্যে ৪৭ জন সেলাই পেশায় যুক্ত হয়েছেন, ২০ জন মুদির দোকান পরিচালনা করছেন, ১৫ জন ব্যাগ তৈরি করছেন, ১৪ জন হোটেল ও চায়ের দোকান পরিচালনা করছেন। এছাড়া কসমেটিকস, অনলাইন পোশাক ব্যবসা, দুগ্ধ ব্যবসা, ফেরি ব্যবসা, হস্তশিল্প ও খাদ্যপণ্য বিক্রির মতো বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন অনেকে।
পল্লীশ্রীর নির্বাহী পরিচালক শামীম আরা বেগম বলেন, “বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতার কারণে নারী নির্যাতনের প্রবণতা বাড়ছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারলে নির্যাতনের ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে আসবে। সে লক্ষ্যেই আমরা প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও প্রারম্ভিক পুঁজি সহায়তা দিয়ে কাজ করছি।”
তিনি বলেন, “সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে নারীদের কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক সুযোগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন।”
কেকে/এজে