বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বাংলাদেশের বোলিং কোচের দায়িত্ব ছাড়লেন শন টেইট      বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ তুলে নিল সরকার      কমানো হলো লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম      ৬ নবজাতকের মৃত্যুর দায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় রোববার      যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা      নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে সতর্কবার্তা আলজেরিয়ার      
দেশজুড়ে
সরকারি দাম কাগজে বাজারে অর্ধেকও নয়, বিপাকে চামড়া ব্যবসায়ীরা
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ৯:৪৮ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো কিশোরগঞ্জেও কুরবানির পশুর চামড়া ঘিরে জমে উঠেছে বেচাকেনা। তবে জেলার সবচেয়ে বড় চামড়ার বাজার শহরের পৌর মার্কেট এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘মোরগ মহল’ এবার পরিণত হয়েছে ক্ষোভ, হতাশা ও দীর্ঘশ্বাসের বাজারে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের আশায় লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে চামড়া কিনলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকালে বাজার ঘুরে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী হাওরাঞ্চল থেকে আসা শত শত ব্যবসায়ী হাজার হাজার পিস গরু ও খাসির চামড়া নিয়ে বাজারে অবস্থান করছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা না থাকায় অধিকাংশ চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না। যারা বিক্রি করছেন, তারাও কিনে আনা দামের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার কাগজে-কলমে চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই মূল্য কার্যকর করার কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে বাজারে ট্যানারি মালিক বা তাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি না থাকায় ঢাকার কিছু পাইকার কম দামে চামড়া কিনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন।

মিঠামইন উপজেলা থেকে আসা চামড়া ব্যবসায়ী নয়ন রবি দাস  বলেন, “হাওর এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ৪০০ পিস চামড়া সংগ্রহ করেছি। পরিবহন, শ্রমিক ও সংরক্ষণ খরচসহ প্রতি পিস চামড়ার পেছনে প্রায় ৭০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি ঢাকার পাইকাররা ১০০ থেকে ৪০০ টাকার বেশি দাম দিতে রাজি নয়। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের মূলধনই হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।”

একই ধরনের হতাশার কথা জানান মৌসুমী ব্যবসায়ী গোপাল সরকার বলেন, “সরকারি ঘোষণার ওপর ভরসা করে ৭০০ টাকা পিস দরে প্রায় ৪০০টি চামড়া কিনেছি। কিন্তু বাজারে এসে দেখি সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৪০০ টাকা দাম করছে। এই ক্ষতি আমরা কীভাবে পুষিয়ে নেব? সরকার যদি মাঠপর্যায়ে নজরদারি করত, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।”

মৌসুমী ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ৩৬০টি চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। এর মধ্যে কিছু চামড়া তুলনামূলক ভালো দামে বিক্রি করতে পারলেও অধিকাংশ চামড়ার দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। তিনি বলেন, “৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে কেনা অনেক চামড়া এখন ১৫০ টাকায় বিক্রি করতে বলা হচ্ছে। কোনো কোনো চামড়ার দাম ৫০ টাকারও কম বলছে পাইকাররা। এমন ব্যবসা করে লাভ তো দূরের কথা, পুঁজি টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবনে আর চামড়ার ব্যবসা করব না।”

সরকার চলতি বছর ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করলেও কিশোরগঞ্জের বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

ব্যবসায়ী সামসুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারিভাবে যে দাম ঘোষণা করা হয়েছে, বাস্তবে তার অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। টেলিভিশনে দেখলাম ৫৭ টাকা ফুট দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, অথচ এখানে ২০ টাকা ফুট হিসাবেও দরদাম হচ্ছে। আমরা সরকারি ঘোষণার ওপর বিশ্বাস রেখে চামড়া কিনেছি। এখন যদি সেই মূল্য বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে ক্ষতির দায় কে নেবে?”

চামড়া ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারে ট্যানারি মালিক ও বড় ক্রেতাদের অনুপস্থিতিই বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ। ঢাকার পাইকাররাও একই অভিযোগ তুলেছেন।

ঢাকা থেকে আসা পাইকার আবু তাহের বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল ১০ থেকে ১৫ হাজার পিস চামড়া কেনা। কিন্তু আজ সারাদিনে মাত্র সাড়ে তিন হাজার পিস কিনতে পেরেছি। কারণ বাজারে কোনো ট্যানারি মালিক বা তাদের প্রতিনিধি আসেননি। ট্যানারি মালিকরা চামড়া না কিনলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই দাম কমে যায়। সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেই তো হবে না, সেই দাম বাস্তবায়নের ব্যবস্থাও করতে হবে।”

এদিকে চামড়া দীর্ঘ সময় অবিক্রিত থাকলে সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে লোকসানে চামড়া বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা, যারা ঋণ কিংবা ধারদেনা করে এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, প্রতিবছরই চামড়া বাজারে একই ধরনের সংকট তৈরি হলেও কার্যকর কোনো সমাধান দেখা যায় না। ফলে সরকার নির্ধারিত মূল্য কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এই চামড়ার বাজারে হাজার হাজার পিস চামড়ার আমদানি হলেও ট্যানারি মালিকদের অনুপস্থিতি, সরকারি নজরদারির ঘাটতি এবং কথিত পাইকারি সিন্ডিকেটের কারণে বাজার কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে লাখ লাখ টাকা লোকসানের মুখে দাঁড়িয়ে প্রান্তিক ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা এখন দিশেহারা। তারা দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা ও হাট-বাজার খাস আদায় কমিটির সদস্য সচিব সৈয়দ শফিকুর রহমান বলেন, “কিশোরগঞ্জ পৌরসভার ঐতিহ্যবাহী চামড়া মহালে প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদুল আজহার পরবর্তী বৃহস্পতিবার জেলার অন্যতম বৃহৎ চামড়ার হাট বসেছে। প্রতিবছর পৌরসভা চামড়া মহাল ইজারা দিলেও এ বছর কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় পৌরসভার পক্ষ থেকে সরাসরি খাস আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এজন্য একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং বিক্রিত চামড়া থেকে নির্ধারিত হারে খাস আদায় করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “গত বছরের তুলনায় এ বছর চামড়ার বাজার কিছুটা দুর্বল। গত বছর এই হাটে প্রায় ৪০ হাজার পিস চামড়া উঠলেও এ বছর প্রায় ২৫ হাজারের কিছু বেশি চামড়া এসেছে। বাজারে চামড়ার সরবরাহ থাকলেও বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত মূল্য পাচ্ছেন না। পুঁজির সংকট এবং বাজার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হচ্ছে না, ফলে বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “চামড়া খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ বা সরকারি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হলে এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এতে ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্পও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।”

সৈয়দ শফিকুর রহমান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “কিশোরগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী চামড়ার হাটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন।”

আগামী হাটগুলোতে আরও বেশি ব্যবসায়ীর অংশগ্রহণ হবে এবং চামড়ার বাজার ধীরে ধীরে তার আগের প্রাণচাঞ্চল্য ও ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে আশা করেন তিনি।

কেকে/এজে



আরও সংবাদ   বিষয়:  চামড়া ব্যবসায়ী   সরকারি দাম  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close