বুকভরা আশা আর পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে মাত্র এক মাস আগে লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাতক্ষীরার শফিকুল ইসলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্থায়ী হলো না। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রের নির্মম বাস্তবতায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে, দীর্ঘ ২৭ দিন পর যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন তিনি আর জীবন্ত মানুষ নন—একটি নিথর মরদেহ। একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে আশাশুনির তরুণ নাহিদুল ইসলাম নাহিদকেও।
লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চলের জেবদিন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত এই দুই রেমিট্যান্স যোদ্ধার মরদেহ যখন সাতক্ষীরায় তাদের নিজ নিজ গ্রামে পৌঁছায়, তখন আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে শুরু হয় স্বজনদের শোকের মাতম। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে প্রিয়জনকে হারানো দুটি পরিবার এখন যেন অথই সাগরে ভেসেছে।
নির্বাক পিতা, বিলাপ করছেন স্ত্রী
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে শফিকুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। হঠাৎ এই বিপুল শোক সহ্য করতে না পেরে শফিকুলের বৃদ্ধ বাবা আফসার আলী বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। একদৃষ্টে ছেলের লাশের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলছেন, “কয় রে শফিকুল, সবাইকে জায়গা দেয়। দেখ কত মানুষ আসছে। ওভাবে শুয়ে থাকলে হবে? উঠো, এই গরমে সবার যেন কষ্ট না হয়।”
বৃদ্ধ পিতার এই অবুঝ আকুতি উপস্থিত প্রতিবেশীদের চোখের জল ধরে রাখতে দেয়নি।
পাশেই দুই কন্যাসন্তানকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছিলেন শফিকুলের স্ত্রী। স্বামীর লাশের উদ্দেশ্যে তার কান্নাভেজা কণ্ঠের প্রশ্ন, “দেখো তোমার বাড়িতে কত মানুষ! তুমি যখন বেঁচে ছিলে আমি কোথাও যাইনি। আজকে তুমি নেই, তোমাকে ঢাকা থেকে নিয়ে আসতে কত বড় বড় মন্ত্রী-এমপিরা ছিল। তুমি আমাদের কোথায় রেখে গেলে? এই মেয়ে দুটোকে আমি কীভাবে বড় করব? কী স্বপ্ন ছিল তোমার?”
বাবার লাশ দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিল তার নাবালক মেয়ে দুটি।
সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, “শফিকুল আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন লেবাননে যায়, তখন সে খুবই হাসি-খুশি ও সদালাপী একটা ছেলে ছিল। কিন্তু হুট করেই আমরা জানতে পারি, সেখানে যাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় সে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের মধ্যেও আমাদের একটুকু স্বস্তি যে, তার মরদেহটি আমরা দেশে ফেরত পেয়েছি। দ্রুত লাশটি দেশে আনার ব্যবস্থা করার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’’
তিনি আরও বলেন, “এই পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র এবং শফিকুলই ছিল তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অনেক টাকা ঋণ-দেনা করে সে বুকভরা আশা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল। বর্তমানে তার বৃদ্ধা মা এবং দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে, যার মধ্যে বড় মেয়েটি নবম শ্রেণিতে পড়ে এবং সে যথেষ্ট মেধাবী। আমি এলাকাবাসী ও আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, যেন পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি ওই মেয়েটির জন্য একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। তাহলে এই অসহায় পরিবারটি অন্তত বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন পাবে।’
খুলনা প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদুর রহমান বলেন, “লেবাননে নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী—নাহিদুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলামের লাশ দেশে আসার পর তাদের পরিবারকে যে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়, সে বিষয়ে অনেকেই খোঁজখবর নিচ্ছেন। প্রবাসী কর্মীর লাশ দেশে আসার পরপরই জরুরি খরচ ও দাফন বাবদ তার পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ৩৫ হাজার টাকার একটি চেক দেওয়া হয়। এছাড়া বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার কারণে ওই পরিবারগুলো পরবর্তী আরও ১৩ লক্ষ টাকা আর্থিক সুবিধা পাবেন। যার মধ্যে ৩ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এবং বাকি ১০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় জীবন বীমা কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে।’
ক্লিয়ারেন্স ও ফ্লাইট সাপেক্ষে লেবাননে নিহত কলারোয়ার অপর প্রবাসী শুভ কুমার দাসের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এই সুবিধাটি শুধু নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের যেকোনো প্রবাসী কর্মীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ২০২৩ সালের ১লা জানুয়ারির পর যারা বৈধভাবে দেশের বাইরে গিয়েছেন, তাদের পরিবার এই ১৩ লক্ষ টাকার পুরো সুবিধাটি পাচ্ছেন। তবে এই তারিখের আগে যারা বিদেশ গিয়েছিলেন, তারা জীবন বীমার ১০ লক্ষ টাকা পাবেন না, শুধু সরকারের পক্ষ থেকে ৩ লক্ষ টাকার অনুদানটি পাবেন। কারণ পূর্ববর্তী জীবন বীমা কর্পোরেশনের এই বিশেষ সুবিধাটি চালু ছিল না।
এদিকে আশাশুনির কাদাকাটি দাখিল মাদ্রাসা৪র প্রাঙ্গণে জানাজা নামাজ শেষে নাহিদকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়। আল হাদিস জামে মসজিদের মাওলানা আব্দুল মালেক গাজী জানাজা নামাজ পড়ান।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ লেবাননের জেবদিন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হয় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৪৮) ও আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম নাহিদের (২০)।
কেকে/এমএ