রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মানুষ যখন ঘর থেকে বের হয়, তখন অন্তত এই বিশ্বাসটুকু রাখতে চায় যে দিনের শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে গুলি চালানো, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সেই স্বাভাবিক বিশ্বাসকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
সরকার বলছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতা যেন অন্য এক গল্প বলে। টিআইবির সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকারের প্রথম একশ দিনে ৬০৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের মনে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
খুলনায় যৌথ অভিযান চলাকালেই প্রকাশ্যে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীতে কারামুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই কুখ্যাত সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। দুটি ঘটনাই ভিন্ন প্রেক্ষাপটের হলেও একটি অভিন্ন সত্য সামনে নিয়ে আসে, তা হলো অপরাধী চক্রের দুঃসাহসিকতা এবং জনপরিসরে নিরাপত্তাহীনতার বিস্তার।
রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, হত্যাকাণ্ড কখনোই স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। কোনো দলের নেতাকর্মী যদি ধারাবাহিকভাবে হামলার শিকার হন, তবে তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। একইভাবে অপরাধজগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ঘিরে সংঘর্ষও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে আনে। কারণ রাষ্ট্রের চোখে প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের মূল্য সমান এবং বিচার নিশ্চিত করাই আইনের শাসনের মূল শর্ত।
উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো, বহু ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হলেও অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয় না। গোয়েন্দা নজরদারি, স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা করেছিল। সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং নিরাপদ নাগরিক জীবন। কিন্তু যদি মানুষ প্রতিদিন খুন, গুলি ও ছিনতাইয়ের সংবাদে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তবে গণতান্ত্রিক অর্জনের অর্থই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করা যায় না; এর প্রকৃত মাপকাঠি মানুষের আস্থা। নাগরিক যদি নিরাপত্তা অনুভব না করে, তবে উন্নয়নের সব সূচকই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই প্রয়োজন অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অপরাধ দমনে দৃশ্যমান কার্যকারিতা।
নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। রাষ্ট্রের উচিত সেই অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। অন্যথায় নিরাপত্তাহীনতার এই দীর্ঘ ছায়া সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্যই গভীর সংকট ডেকে আনবে।
কেকে/ এমএস