রোববার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
শিরোনাম: কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর      হামের উপসর্গে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু      বিরোধীদলের প্রধান কাজ দেশকে অশান্ত করা : প্রধানমন্ত্রী      মউক চেয়ারম্যান হলেন মোতাহার তালুকদার      প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে নতুন বাজেট ঘোষণা পাকিস্তানের      বাবার স্মৃতিবিজড়িত ‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী      সব নাগরিকের জন্য বাজেট      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস : তোমার রক্তে বাঁচুক পৃথিবী, আঁকুক নতুন স্বপ্ন
সৈয়ব আহমেদ সিয়াম
প্রকাশ: রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

আজ ১৪ জুন, বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। দিনটি সেসব নিঃস্বার্থ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন, যারা সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগেও রক্তের কোনো কৃত্রিম বিকল্প আবিষ্কৃত হয়নি। তাই একজন মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচাতে মানুষের রক্তই একমাত্র ভরসা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) তথ্যমতে, একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ১ শতাংশ মানুষ নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান করলে সেই দেশের মৌলিক রক্তের চাহিদা পূরণ সম্ভব। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার কম হওয়ায় প্রতিদিন বহু মানুষ সংকটে পড়ছেন।

বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ প্রসবোত্তর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। ডঐঙ-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৭০ হাজার নারী এ কারণে মারা যান, যার একটি বড় অংশ সময়মতো রক্ত না পাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বছরে ১০ কোটিরও বেশি ইউনিট রক্তের ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশে বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ ব্যাগ রক্তের চাহিদা থাকলেও ঘাটতি রয়ে যায়। বাংলাদেশে মোট মাতৃমৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে। প্রতিবছর হাজারো মা সময়মতো রক্ত না পাওয়ায় প্রাণ হারান। শুধু প্রসূতি নয়, থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার, ডায়ালাইসিস, দুর্ঘটনা ও অস্ত্রোপচারজনিত রোগীদের জীবনও নির্ভর করে নিরাপদ রক্তের ওপর।

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু মারজিয়া প্রতি মাসে রক্তের অপেক্ষায় থাকে। ডায়ালাইসিস রোগী কিংবা ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত অসংখ্য মানুষের জীবনও নির্ভর করে অচেনা কোনো রক্তদাতার মানবিকতার ওপর। একজন রক্তদাতার উপস্থিতি অনেক সময় একটি পরিবারের জন্য আশার আলো হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে নিরাপদ রক্ত আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। 

১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘সন্ধানী’ এবং ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বাঁধন’ এ আন্দোলনের পথিকৃৎ। পাশাপাশি ‘বিআরএফ ইয়ুথ ক্লাব’সহ বিভিন্ন সংগঠন তরুণদের রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করছে। স্থানীয় পর্যায়ে নওগাঁ ব্লাড সার্কেলের মতো সংগঠনগুলোও রক্তের অভাবে যেন কোনো প্রাণ ঝরে না যায়, সেই লক্ষ্য নিয়ে দিন-রাত কাজ করছে।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রক্তদানের আন্দোলনে নতুন গতি এনেছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে মুহূর্তেই রক্তদাতার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। প্রযুক্তির এই ইতিবাচক ব্যবহার অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করছে।

নারীদের রক্তদান নিয়েও সমাজে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অথচ চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ ও নির্ধারিত ওজনের নারীও নিরাপদে রক্ত দিতে পারেন। তাই নারীদের আরও বেশি রক্তদানে অংশগ্রহণ জরুরি। একইভাবে তরুণদের জন্য ১৮তম জন্মদিন হতে পারে মানবিক জীবনের অনন্য সূচনা। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর প্রথম রক্তদান একজন মানুষের সামাজিক দায়বদ্ধতার সুন্দর প্রকাশ হতে পারে।

রক্তদানের জন্য সাধারণত বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছর এবং ওজন কমপক্ষে ৪৫ কেজি হওয়া প্রয়োজন। রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রা ও হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক থাকতে হবে। পুরুষরা প্রতি তিন মাস এবং নারীরা প্রতি চার মাস পরপর রক্ত দিতে পারেন।

নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করতে রক্তদাতার মাদকমুক্ত ও সুস্থ জীবনযাপনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে হেপাটাইটিস ও এইচআইভির ঝুঁকি বেশি থাকায় তাদের রক্তদান অনিরাপদ হতে পারে।

রক্তদান সম্পর্কে সামাজিক ও ধর্মীয় ভুল ধারণা দূর করতে মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। ইসলাম মানবজীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল’ (সূরা মায়িদাহ : ৩২)। তাই রক্তদান কেবল মানবিক কাজই নয়, এটি একটি মহৎ ইবাদতও।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক ব্যাগ রক্তকে বিভিন্ন উপাদানে বিভক্ত করে একাধিক রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায়। লোহিত রক্তকণিকা, প্লাজমা ও প্লাটিলেট পৃথকভাবে বিভিন্ন রোগীর জীবন বাঁচাতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ একজন রক্তদাতা একসঙ্গে একাধিক মানুষের জীবনরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন।

নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করতে সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। জেলা পর্যায়ে আধুনিক ব্লাড ব্যাংক স্থাপন, রক্তের বাণিজ্য বন্ধ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সহায়তা এবং জাতীয় রক্তদাতা ডাটাবেজ গড়ে তোলা জরুরি। একইসঙ্গে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইনফ্লুয়েন্সার ও সেলিব্রিটিরাও রক্তদানকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

রক্তদানের স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও রয়েছে। নিয়মিত রক্তদান শরীরে অতিরিক্ত আয়রন কমায়, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস করে এবং নতুন রক্তকণিকা তৈরিতে শরীরকে উদ্দীপিত করে। রক্তদানের আগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা বিনামূল্যেও করা হয়।

বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১১ কোটি ৮৫ লাখ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করা হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। তাই রক্তদানকে কেবল একটি সাময়িক সাহায্য হিসেবে নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে।

রক্তদানের পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানি ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ জরুরি। একইসঙ্গে রক্তদাতাদের যথাযথ সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানানোও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ তারা কোনো সাধারণ মানুষ নন, তারা জীবনদাতা।

থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার, ডায়ালাইসিস, দুর্ঘটনা ও অসংখ্য রোগী আজ বেঁচে আছেন স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী মানুষের কারণে। তাই আপনার বয়স যদি ১৮ বছর পূর্ণ হয় এবং আপনি সুস্থ থাকেন, তাহলে নিয়মিত রক্তদানে এগিয়ে আসুন। আপনার এক ব্যাগ রক্ত হয়তো একটি জীবন, একটি পরিবার, এমনকি একটি ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। রক্ত দিন, জীবন বাঁচান। শুভ বিশ্ব রক্তদাতা দিবস।

লেখক : রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ)

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close