রাত বাজে ১১টা। এতক্ষণ ঘুমিয়ে পড়ার কথা ছিল ৭ বছর বয়সী কবিরের। কিন্তু সে তখনো তার প্রতিবেশীর ঘরে কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে আছে। চারপাশের পরিবেশ ও ঘরজুড়ে নীরবতা, কেবল মনিটরে বাজছে ক্যামেরায় ধারণ করা কিছু ভিডিও ক্লিপ। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রক হিসেবে বসে আছে স্বপন নামের এক তরুণ যে কিনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার আশায় কবিরকে সাথে নিয়ে ‘কৌতুক’ শ্রেণির ভিডিও কনটেন্ট তৈরী করে। মানুষকে হাসানোর চেষ্টা করে। গভীর মনোযোগ দিয়ে সে ভিডিও এডিট করছে। কবির চোখ বড়-বড় করে তাকিয়ে আছে স্ক্রিনের দিকে। তার চোখে কৌতূহল, উত্তেজনা আর অদ্ভুত এক অপেক্ষা।
এই বয়সে যেখানে মায়ের কাছে গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ার কথা, সেখানে সে শিখছে কিভাবে ভিডিও কাটতে হয়, কিভাবে হাসির দৃশ্য যোগ করতে হয়, কিভাবে ভিডিও ‘ভাইরাল’ বানানো যায়। কিছুক্ষণ পর ভিডিও আপলোড হয়। তারপর শুরু হয় অপেক্ষার আরেক অধ্যায় 'ভিউ কত হলো, লাইক কত এলো, কতজন শেয়ার করল'। ঠিকঠাক যোগ-বিয়োগ শিখতে না পারা ছোট্ট কবিরও এখন এই সংখ্যার খেলায় অংশ নিয়েছে। তার মুখ থাকে লাখ-লাখ আর মিলিয়ন ভিউয়ের আলাপ।
এই দৃশ্য এখন আর শুধু এক কবিরের নয়। এই ভাইরাল বা সস্তা জনপ্রিয়তার স্রোতে এখন গা ভাসিয়ে দিচ্ছে শহর থেকে প্রান্তিক গ্রামের হাজারও শিশু, কেউ-কেউ পরিবারের অজান্তে আবার কাউকে পিতামাতা বা পরিবারই উস্কে দিচ্ছে। ডিজিটাল যুগে এটা এক নতুন বাস্তবতা যেখানে শিশুরা খেলাধুলার মাঠে বড় না হয়ে ক্যামেরার ফ্রেমে বড় হচ্ছে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির হাত ধরে গোটা বিশ্ব যেন এক ক্লিকেই হাতের মুঠোয় এসে গেছে। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে কন্টেন্ট তৈরির যে সহজলভ্যতা তৈরি হয়েছে, তাতে প্রতিভা আর যোগ্যতার মূল্য যেন ক্রমশ কমে যাচ্ছে। যে কেউই এখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সামান্য কিছু বলে বা করেই 'কন্টেন্ট ক্রিয়েটর' তকমা পেয়ে যাচ্ছে। আর আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই দৌড়ে এখন শিশুরাও পিছিয়ে নেই। তারা কি সত্যিই স্বেচ্ছায় এই পথে আসছে নাকি এর পেছনে রয়েছে অভিভাবকদের অতি-উৎসাহ, সস্তা জনপ্রিয়তা আর দ্রুত অর্থ উপার্জনের মোহ সে প্রশ্নই এখন উঠে আসছে সকলের সামনে।
শিশুরা যখন এখনও নিজের পছন্দ-অপছন্দ বুঝে ওঠার বয়সে পৌঁছায়নি, তখন তাদের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করানো হচ্ছে। তাদের শেখানো হচ্ছে মুখস্থ বুলি, যা তারা উচ্চারণ করছে যন্ত্রের মতো। অনেক সময় দেখা যায় তাদের ভিডিওর বিষয়বস্তু তদের কোমল বয়সের সাথে বড্ড বেমানান। যে বয়সে তাদের হাতে বই,খাতা,কলম থাকা উচিত, সে বয়সে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ক্যামেরা আর মোবাইল। স্বাভাবিক শৈশবের আনন্দ ভুলে তারা জনপ্রিয়তার মোহে জড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) শিশু ও কিশোরদের জন্য অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। সংস্থাটির মতে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে সময় কাটানো শিশুদের ঘুম, শারীরিক কার্যকলাপ এবং মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুদের মাঝে মোবাইল আসক্তির মাত্রা দিন-দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সংখ্যাটা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে দর্শক হিসেবে তেমনি বাড়ছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে। এর উপর কেনো জাতীয় জরিপ না হওয়ায় দেশে ঠিক কত সংখ্যক শিশু কনটেন্ট ক্রিয়েটর আছে তা বলা মুশকিল তবে শিশুদের নিয়ে কনটেন্ট, ফ্যামিলি ভ্লগ এবং শিশু অভিনয়ভিত্তিক শর্ট ভিডিওর প্রবণতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২৬ সালে icddr,b-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ৮৩ শতাংশ শিশু প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের সঙ্গে ঘুমের ব্যাঘাত, মনোযোগের ঘাটতি এবং মানসিক চাপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সুস্থ স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের জন্য অবাধ খেলা, কল্পনা করা, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা এবং হাতেকলমে নতুন কিছু আবিষ্কার করার মতো সৃজনশীল কাজের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু যখন একটি শিশু নিয়মিত ক্যামেরার সামনে পারফর্ম করতে থাকে, তখন তার শৈশবের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতাগুলো সীমিত হয়ে যায় এবং সে বঞ্চিত হয় শৈশবের প্রকৃত আনন্দ থেকে।
সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় শিশুদের এমন বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্ত করে, যা তাদের বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রেম, বিচ্ছেদ, আবেগঘন সম্পর্ক কিংবা প্রাপ্তবয়স্কদের ভাষা,গালি ও আচরণ অনুকরণ করে তৈরি করা ভিডিওগুলো শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনলাইন জগতে শিশুদের নিরাপত্তা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ২৩ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো গুরুতর অনলাইন ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে।
ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্য, নেতিবাচক মন্তব্য এবং অনলাইন হয়রানি তরুণদের মানসিক চাপের অন্যতম কারণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাবা বলেন, তার ৮ বছর বয়সী সন্তান নিয়মিত ফেসবুকে রিলস ভিডিও তৈরি করে।
তিনি জানান, প্রথমে এটা খেলা ছিল। এখন সে প্রতিদিন জিজ্ঞেস করে আজ যে ভিডিও দিলে কত ভিউ আসছে, কত লাইক আসছে? কম ভিউ হলে সে মন খারাপ করে। পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলে।
বাংলাদেশি কনটেন্ট ক্রিয়েটর কামরুন নাহার ডানা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কনটেন্ট তৈরির শুরুটা শখ হলেও পরে এটি একটি দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি, দর্শকের প্রত্যাশা এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চাপে অনেক সময় মানসিক ক্লান্তিতে থাকতে হয়।
মানুষ সামাজিক জীব। একটি সমাজ সুন্দর হয় সমাজস্থ সুনাগরিকের সংস্পর্শে। এজন্য প্রয়োজন সুশিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং শিষ্টাচার। একজন শিশু যদি ছোটবেলাতেই শিখে যায় যে অর্থ আর জনপ্রিয়তাই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি, তাহলে তার নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠার সুযোগ কোথায়? অভিভাবকদের দায়িত্ব হচ্ছে শিশুরা যাতে বয়স অনুযায়ী মানসিক বিকাশের সুযোগ পায়, তারা যেন শিখতে পারে কীভাবে বিনয়ী, সহানুভূতিশীল এবং দায়িত্বশীল হতে হয়। ছোট বয়সেই মানবিক মূল্যবোধ আর শিষ্টাচারের বীজ রোপণ না করলে বড় হয়ে তারা ভোগবাদী আর আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে।
রাত গভীর হলে কবির হয়তো একসময় ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভাইরালের লোভে তার শৈশব কি ঘুমিয়ে পড়ছে না ধীরে ধীরে? যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল মাঠ, বই, বন্ধুত্ব আর কল্পনার রঙে ভরা, সেই পৃথিবী আজ অনেক ক্ষেত্রে আটকে যাচ্ছে ক্যামেরার ফ্রেম, লাইক-কমেন্ট আর ভিউয়ের সংখ্যায়।
প্রযুক্তি অবশ্যই সময়ের প্রয়োজন এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে তা শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু যখন জনপ্রিয়তা, অর্থ কিংবা সামাজিক স্বীকৃতির মোহ শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জায়গা দখল করে নেয়, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি ভাইরাল ভিডিও হয়তো কয়েক দিনের আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর কখনো ফিরে আসে না।
এখনই সময় সচেতন হয়ে শিশুদের হাত থেকে মোবাইল, ক্যামেরা সরিয়ে নিয়ে তাদের জন্য সুন্দর, নিরাপদ ও মানবিক শৈশব উপভোগের পরিবেশ নিশ্চায়ন করার।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
কেকে/ এমএস