জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয় নতুন পরিবেশ। মুক্ত বাতাসে দলীয় কার্যক্রম শুরু করে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলো। স্বস্তি ফেরে জামায়াতে ইসলামীতেও। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ শূন্য মাঠে নতুন উদ্যমে দল গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে দলটি।
শুরু হয় দলটির জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের ধারাবাহিক কর্মসূচি জনমনে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। যার প্রতিফলন ঘটে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। দলটি ৬৮টি আসনে জয় পায় এবং মোট ভোটের প্রায় ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট লাভ করে। তবে এ সাফল্যের পাশাপাশি দলটির অভ্যন্তরে দেখা দেয় নানা বিশৃঙ্খলা। দলের নীতি-সিদ্ধান্তে বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দেখা যায় দলটির অনেক নেতাকর্মী ও প্রার্থীদের। এমনকি অনেকের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের পতনের পর জামায়াতকে নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। সেই জায়গা থেকে অনেকেই ভোটে জামায়াতকে বেছে নেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলটির নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। একইসঙ্গে দলটির এই কর্মীরা আদর্শিকভাবে দলকে ধারণ করেন কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে দলীয় নেতাদের ভাষ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আগের সাংগঠনিক কাঠামো অনেকটাই শিথিল হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে দ্রুত সংগঠন বিস্তারের লক্ষ্যে সহযোগী সদস্য সংগ্রহে আগের মতো কঠোর যাচাই-বাছাই করা হয়নি। ফলে এখন দেখা যাচ্ছে যারা আগে দলের নিয়মিত কর্মী ছিলেন না বা নতুন যুক্ত হয়েছেন তারা দলের বাইরে গিয়ে অনেক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। যার দায়ভারও দলকে বহন করতে হচ্ছে। আবার ভোটের পর নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী প্রার্থীদের ঘিরে স্থানীয়ভাবে নতুন এক ধরনের বলয় গড়ে উঠছে। এটা নিয়েও দলের অভ্যন্তরে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে বরাদ্দ হওয়া অর্থের একটি অংশ এমপির ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস), আত্মীয়স্বজন, দলটির কর্মী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করার অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে সংসদ সদস্যের অনুকূলে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এর মধ্যে কয়রা উপজেলায় ২০১ জনের তালিকা করে ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা বিতরণ দেখানো হয়েছে। প্রকাশিত তালিকায় তিন নম্বরে রয়েছে এমপির এপিএস আবু ওবাইদার নাম। এক নম্বরে রয়েছেন এমপির ভাগনে আহসান হাবিব। এছাড়া উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আসমাতুল্যাহ ও ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাজহারুল ইসলামের নামও তালিকায় রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি তালিকার বেশিরভাগ ব্যক্তিই স্বচ্ছল ও তাদের অনেকেই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমপির এপিএস পরিচয় দেওয়া আবু ওবাইদা বলেন, এ তালিকা তো আপনাদের পাওয়ার কথা নয়। তালিকা গোপন থাকার কথা ছিল। অর্থ গ্রহণের বিষয়ে তিনি এড়িয়ে যান। সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে কয়রা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, তালিকায় বেশির ভাগই গরিব মানুষের নাম রয়েছে, তবে কিছু দলীয় লোক থাকতে পারেন। এপিএসের নাম কীভাবে এসেছে, তা তার জানা নেই। কয়রার ইউএনও মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের অর্থ হতদরিদ্রদের জন্য। তবে উৎসব উপলক্ষে বিশেষ বরাদ্দের তালিকা অনেক সময় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেই করা হয়ে থাকে।
এদিকে শৃঙ্খলা ভঙের অভিযোগে দলটির মাগুরা জেলা আমির ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরা-২ আসনের দলীয় মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক এমবি বাকেরকে দ্বিতীয়বারের মতো জেলা আমিরের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তার রুকনিয়াত (সদস্যপদ) তিন মাসের জন্য মূলতবি করা হয়েছে। গত শুক্রবার সকালে মাগুরা জেলা জামায়াতের দোয়ারপাড় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জেলা শূরা ও কর্মপরিষদের সভায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানান যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের পরিচালক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মুবারক হোসেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের জামিনের তদবিরে প্রত্যয়নপত্র প্রদানের অভিযোগে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তাকে পদচ্যুত করা হয়েছিল। পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তাকে পুনর্বহাল করা হয়।
তবে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে তার বিরুদ্ধে সংগঠনের অভ্যন্তরে বৈষম্যমূলক আচরণ, অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা, অর্থ তছরুফসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা। এসব অভিযোগ নিয়ে একাধিক লিখিত আবেদন কেন্দ্রীয় আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের কাছে পাঠানো হয়।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গঠন করে সংগঠন পরিচালনা, নির্বাচনি তহবিলের অর্থ ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন, সালিশ ও চাকরি বাণিজ্যের অভিযোগ, জমি ক্রয়-বিক্রয়ে আর্থিক অনিয়ম এবং স্থানীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে ব্যক্তি পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া প্রভৃতি।
এছাড়া সঞ্চয়পত্রে অর্থ বিনিয়োগসহ সুদভিত্তিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা এবং মতবিরোধের কারণে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের দায়িত্ব থেকে অপসারণের অভিযোগও কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্তাধীন রয়েছে বলে দলীয় সূত্র দাবি করেছে।
অধ্যাপক এমবি বাকেরের অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে স্থায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেও দলটিতে তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় জামায়াত তিন প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। একইসঙ্গে বিলুপ্ত করা হয় সুনামগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা কমিটি। তবে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের খোলা কাগজকে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী পরিচালনার জন্য আমাদের একটা গঠনতন্ত্র আছে। এ গঠনতন্ত্র মোতাবেক দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত এ বিধি অনুসরণ করা হয়। তারপরও তো এটা মানুষের সংগঠন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটে কিংবা শৃঙ্খলার বাইরে গিয়েও কিছু কাজ হয়ে যায়। তখন আমরা বিধি মোতাবেক গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নিয়ে থাকি। এসব বিষযয়ে আমরা কখনো আপস করি না। সব ধরনের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সবসময় জামায়াতে ইসলামী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে দীর্ঘদিন স্বৈরশাসন চলায় জাতি গঠনে রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব ছিল, তা যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। একইসঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকের মধ্যেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। ফলে সমাজে বিভিন্ন ধরনের অসংগতি দেখা দেয়। এক্ষেত্রে সরকারের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে সমাজ আরও সুশৃঙ্খল ও সুন্দর হয়ে উঠবে।’
কেকে/ এমএস