বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের সীমান্ত লাগোয়া কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম ব্যাঙডেবা। মানচিত্রে এটি কক্সবাজারের অংশ হলেও বাস্তব জীবনে গ্রামটির মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিত্যদিনের জীবনযাত্রা অনেকটাই নির্ভরশীল পাশ্ববর্তী জেলা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ও রামুর ঈদগড় এলাকার ওপর। অথচ মাত্র দুই কিলোমিটার সড়ক ও কয়েকটি সেতুর অভাবে প্রায় একশ পরিবারের এই জনপদ আজও রয়ে গেছে উন্নয়নের মূলধারার বাইরে।
রোববার (২১ জুন) সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যাঙডেবা গ্রামের সঙ্গে বাইশারী ও ঈদগড় বাজারের যোগাযোগের একমাত্র পথটি অত্যন্ত দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ। চারদিকে পাহাড় ঘেরা এই জনপদের চিত্র কোথাও সরু মাটির পথ, কোথাও সুউচ্চ ও পাহাড়ি ঢালু পথ, কোথাও খাল পার হতে হয় বাঁশের সাঁকো দিয়ে। বর্ষা মৌসুমে পুরো এলাকা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। তখন রোগী, শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন, স্মারকলিপি ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ধর্ণা দিয়েও মাত্র দুই কিলোমিটার সড়ক ও কয়েকটি সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করা যায়নি। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই দুর্ভোগ বয়ে বেড়াচ্ছে।
গ্রামবাসীরা জানান, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে অনেক সময় কয়েকজন মিলে কাঁধে করে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। বর্ষাকালে এই দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। স্থানীয়দের দাবি, সময়মতো চিকিৎসা সুবিধা না পাওয়ায় গত কয়েক দশকে অন্তত ২০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
ব্যাঙডেবা গ্রামের মানুষ চিকিৎসা, কেনাকাটা, শিক্ষা সহ বিভিন্ন প্রয়োজনে বেশি যাতায়াত করেন নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ও ঈদগড়ে। গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে বাইশারী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, বাইশারী শাহ নুরুদ্দীন দাখিল মাদ্রাসা, ঈদগড় এএমবি উচ্চ বিদ্যালয় এবং ঈদগড় বদর মোকাম জামেয়া ফেরদৌসিয়া আলীম মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রতিদিন শতাধিক শিক্ষার্থী প্রায় দুই কিলোমিটার দুর্গম পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, গ্রামে ধান, শাকসবজি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন হলেও যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সঠিক সময়ে বাজারে নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। পরিবহন সংকট ও অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেক সময় লোকসান গুনতে হয়।
অন্যদিকে আধুনিক নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত পুরো গ্রাম। এখনো সেখানে বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি। মোবাইল নেটওয়ার্কও অত্যন্ত দুর্বল। ফলে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্ম ডিজিটাল সুবিধা থেকে পিছিয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুতায়নের প্রতিশ্রুতি মিললেও ভোট শেষে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। বছরের পর বছর ধরে শুধু আশ্বাসই শুনে আসছেন তারা।
এলাকাবাসীর মতে, মাত্র দুই কিলোমিটার সড়ক ও কয়েকটি সেতু নির্মাণ করা হলে ব্যাঙডেবা গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
বাইশারী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী আবুল কালাম বলেন, জন্মের পর থেকে দেখে আসছি আমাদের গ্রাম উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি। সড়ক নেই, বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল নেটওয়ার্কও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। প্রতিদিন কষ্ট করে স্কুলে যাতায়াত করতে হয়। আমরা চাই দ্রুত সড়ক ও বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা হোক।
ঈদগড় এএমবি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাকিম বলেন, রামু উপজেলার অন্যান্য এলাকায় উন্নয়ন হলেও ব্যাঙডেবা এখনো পিছিয়ে আছে। আমাদের গ্রামের মানুষ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সরকারের কাছে অনুরোধ, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এলাকাটিকে উন্নয়নের আওতায় আনা হোক।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহ আলম, মো. সেলিম উল্লাহ, মো. শামসুল আলম, মো. নুরুল আলম ও মো. জলিল সহ আরও অনেকে বলেন, আমাদের চাওয়া খুব বেশি নয়। মাত্র কয়েকটি সেতু আর দুই কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হলে শত শত মানুষের দুর্ভোগ কমে যাবে। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী—সবার জীবন সহজ হবে।
এ বিষয়ে জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য একরামুল হক বাবুল বব্বা এটি আমার ওয়ার্ডের সবচেয়ে অবহেলিত জনপদ। এখানে প্রায় একশ বছর ধরে মানুষের বসবাস হলেও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের মুখ দেখেনি। রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নিলে বন বিভাগের বিভিন্ন জটিলতার মুখে পড়তে হয়। রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে গেলে অনেক সময় পথেই মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
ব্যাঙডেবা যেন উন্নয়ন বৈষম্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট অবকাঠামোর যুগ, অন্যদিকে মাত্র দুই কিলোমিটার রাস্তার অভাবে শতাধিক পরিবার এখনো বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা—দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে এবার বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হবে, আর উন্নয়নের স্রোতে যুক্ত হবে ব্যাঙডেবার মানুষও।
কেকে/এলএ