একসময় জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা না জেতার কারণে বারবার সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন লিওনেল মেসি। কিন্তু ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় যেন বদলে দেয় তার ক্যারিয়ারের গতিপথ। এরপর ফিনালিসিমা, বিশ্বকাপ ও আরেকটি কোপা আমেরিকা জিতে একের পর এক রেকর্ড গড়ে চলেছেন আর্জেন্টাইন এই মহাতারকা। ২০২৬ বিশ্বকাপেও বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি লিখছেন নতুন ইতিহাস, আরও উজ্জ্বল করছেন নিজের সোনালি অধ্যায়।
ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত ২০২১ কোপা আমেরিকায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন মেসি। পুরো টুর্নামেন্টে চার গোল ও পাঁচ অ্যাসিস্ট করে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ গোলে অবদান রাখা খেলোয়াড়। ফাইনালে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপা-খরা কাটায় আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে জাতীয় দলের জার্সিতে প্রথম বড় শিরোপার স্বাদ পান মেসি।
বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁয়ে দেখছেন মেসি
কোপা জয়ের পর আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাসও যেন কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ২০২২ সালে ফিনালিসিমায় ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালির মুখোমুখি হয় আলবিসেলেস্তেরা। ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ইতালিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেয় আর্জেন্টিনা। মেসি ছিলেন ম্যাচের অন্যতম সেরা পারফরমার। এটি ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় অর্জন।
তবে মেসির জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় লেখা হয় একই বছরের শেষ দিকে কাতার বিশ্বকাপে। সৌদি আরবের বিপক্ষে হার দিয়ে শুরু হলেও আর্জেন্টিনা পরের ম্যাচেই ঘুরে দাঁড়ায়। মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায় মেসির আর্জেন্টিনা।
অবশেষে আবারও মেসি সুযোগ পান বিশ্বকাপ জেতার। এবার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেই ফাইনালে দুই গোল করেন মেসি। টাইব্রেকারে জয় পেয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা। আর ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতাও পূরণ করেন মেসি। পুরো টুর্নামেন্টে সাত গোল ও তিন অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বল জেতেন তিনি।
বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে হয়তো ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেবেন মেসি। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে উল্টো। ২০২৪ কোপা আমেরিকাতেও দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করেও আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় কোপা আমেরিকার শিরোপা জিততে সহায়তা করেন। এর মাধ্যমে স্পেনের পর দ্বিতীয় দল হিসেবে টানা তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা—ফিনালিসিমা, বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা—জয়ের কীর্তি গড়ে আর্জেন্টিনা।
মেসির সেই ঐতিহাসিক গোল উৎযাপন
এরপর শুরু হয় ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান। বয়স তখন ৩৮। অনেকেই মনে করেছিলেন, আগের মতো প্রভাব হয়তো আর রাখতে পারবেন না মেসি। কিন্তু মাঠে নেমেই সব সংশয় উড়িয়ে দেন তিনি।
আসরের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও জোড়া গোল করে দলকে জয় এনে দেন। শুধু গোল করাই নয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ গড়া এবং সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনন্য।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সেই দুই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ইতিহাসেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যান মেসি। টুর্নামেন্টটির সর্বকালের সেরা গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসে আরও একটি রেকর্ড নিজের করে নেন তিনি। প্রায় দুই দশক ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে যাওয়ার পরও তার ক্ষুধা ও ধারাবাহিকতা ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করছে।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকার আগে জাতীয় দলের হয়ে শিরোপাহীন মেসিকে নিয়ে সমালোচনার শেষ ছিল না। অনেকেই তাকে দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করে প্রশ্ন তুলতেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তিনি সেই সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই।
কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, বিশ্বকাপ, দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে একের পর এক রেকর্ড—সব মিলিয়ে মেসি এখন শুধু আর্জেন্টিনার নয়, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ক্যারিয়ারগুলোর একটির মালিক। বয়স বাড়ছে, কিন্তু অর্জনের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, মেসির সোনালি অধ্যায়ের শেষ আসলে কোথায় ?