বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
শিরোনাম: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্ল্যানারি সেশনে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী      বন্যার শঙ্কায় উত্তরাঞ্চল      সহযোগিতার নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা      অনলাইন জুয়া–বেটিং প্রতিরোধে সংসদে বিল      বিশ্বনেতাদের জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর       কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে দুর্ভোগে না পড়ে : সমাজকল্যাণমন্ত্রী      রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
দানবাক্সের হিসাব
সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা এখন সময়ের দাবি
কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ১:২৬ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

গত ১৮ জুন ২০২৬ সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের নির্দেশে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের ৭০০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দানবাক্স সিলগালা করা হলো। মাত্র চার দিন পর প্রকাশ্যে গণনায় বেরিয়ে আসে — ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, ৭ আনা সোনা এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। চার দিনের এই হিসাব বলছে, বছরে এই একটি মাজারেই আসে ১৫ থেকে ১৬ কোটি টাকার বেশি। এই সংখ্যাটি শুধু একটি মাজারের গল্প নয় — এটি সারা দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অব্যবস্থাপনার এক জীবন্ত দলিল।

শুধু মাজার নয়, প্রশ্ন সর্বত্র

বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় দেশ। এখানে মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার যেমন আছে, তেমনি আছে মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও বিহার। এই প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেই ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রতিদিন নগদ টাকা, সোনাদানা ও বৈদেশিক মুদ্রা দান করেন — নিজের বিশ্বাস ও আবেগ থেকে। কিন্তু সেই দানের অর্থ কোথায় যায়, কে ব্যবহার করে, কীভাবে খরচ হয় — তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেই নেই।

মুসলিম প্রতিষ্ঠানে যেমন মাজারের খাদেম গোষ্ঠী শত বছর ধরে এই অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে, হিন্দু মন্দিরে পুরোহিত বা সেবায়েত কমিটি, খ্রিষ্টান গির্জায় পরিচালনা পর্ষদ এবং বৌদ্ধ বিহারেও একইভাবে দানের অর্থ সীমিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অডিট নেই, কোনো সরকারি নজরদারি নেই।

দেশজুড়ে একই চিত্র

ঢাকার গোলাপ শাহ মাজার, শাহ আলী বোগদাদী মাজার, চট্টগ্রামের শাহ আমানত মাজার — এগুলোর দানের হিসাব যেমন অস্বচ্ছ, তেমনি ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনা কালীমন্দির বা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা মন্দিরের মতো বড় হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দানবাক্সের হিসাবও একইভাবে জনসাধারণের নাগালের বাইরে। বড় গির্জা ও বৌদ্ধ বিহারগুলোও এই প্রশ্নের বাইরে নয়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই অর্থ নিয়ন্ত্রণ করে। মাদক ব্যবসা, পেশিশক্তির ব্যবহার এবং নানা অপকর্মে এই অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে বারবার উঠেছে।

সামনে আছে একটি সফল মডেল

সমাধান আমাদেরই দেশে আছে। কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদ এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। এই মসজিদের দানবাক্স জেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট সময় পর পর খোলা হয়। সংগৃহীত অর্থ কোনো ব্যক্তির পকেটে যায় না — সরকারি নজরদারিতে মাদ্রাসা ও এতিমখানা পরিচালনা, জটিল রোগীদের চিকিৎসা এবং অসহায় মানুষের পুনর্বাসনে ব্যয় হয়।

এই মডেল কেবল মসজিদের জন্য নয় — মন্দির, গির্জা, বিহার সহ সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এটি সমানভাবে প্রযোজ্য। ধর্মীয় পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখেও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব — পাগলা মসজিদ তার জীবন্ত প্রমাণ।

সংস্কারের পথে বাধা

এই সংস্কারের পথ মসৃণ নয়। শাহজালাল মাজারের অর্থ গণনার সিদ্ধান্তের মাত্র তিন দিনের মাথায় সাহসী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে সিলেট থেকে তড়িঘড়ি প্রত্যাহার করা হয়। এটি প্রমাণ করে, এই আর্থিক সিন্ডিকেটের শিকড় কতটা গভীরে এবং এর পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক লবিং কতটা শক্তিশালী।

সংস্কারের বিরোধীরা সরকারি নিয়ন্ত্রণকে 'ধর্মে হস্তক্ষেপ' বলে প্রচার করে ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে — এটি সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। কিন্তু দানের অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করা ধর্মের বিরোধিতা নয়, বরং এটি দানকারীর প্রতি সততার দায়।

এখন করণীয়

তিনটি পদক্ষেপ অবিলম্বে দরকার। প্রথমত, ধর্ম মন্ত্রণালয়, ওয়াকফ এস্টেট এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সব ধর্মের প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দানবাক্স প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে নিয়মিত অডিটের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, সংগৃহীত অর্থ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণে ব্যয়ের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ একটি স্বচ্ছ ট্রাস্ট গঠন করতে হবে।

মসজিদের মুসল্লি, মন্দিরের ভক্ত, গির্জার প্রার্থনাকারী বা বিহারের বৌদ্ধ — সবাই একই আকাঙ্ক্ষায় দান করেন: মানুষের কল্যাণ হোক। সেই দানের অর্থ যদি মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের পকেটে যায়, তাহলে এটি কেবল আর্থিক অনিয়ম নয় — এটি ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা। এই প্রতারণা বন্ধ করতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী
কলামিস্ট ও গবেষক

কেকে/এলএ


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close