শ্রীপুর পৌরসভার বাজেট ঘোষণা সভায় সাধারণ নাগরিক, পেশাজীবী বা কমিউনিটির কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি চোখে পড়েনি। পৌর প্রশাসকের সভাপতিত্বে সভায় পৌর কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাই উপস্থিত ছিলেন। কোনো রকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই আধা ঘণ্টায় (৩০ মিনিট) প্রথম শ্রেণির গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার বাজেট ঘোষণা করেন পৌরসভার প্রশাসক ও শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাহিদ ভূঞা।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে শুরু হওয়া বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠান শেষ হয় ১২টা ৪০ মিনিটে। এ সময় কয়েকজন সাংবাদিক ছাড়া পৌরসভার কোনো নাগরিক বা কোনো কমিউনিটির প্রতিনিধির উপস্থিতি ছিল না। তবে বাজেট ঘোষণার এ আয়োজনে পৌরসভার সাধারণ নাগরিক, পেশাজীবী, সুশীল সমাজ কিংবা বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি স্থানীয় মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানটি পৌরসভা কার্যালয়ের তৃতীয় তলার সভাকক্ষে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে স্থানীয় সচেতন নাগরিক, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি বা সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ চোখে পড়েনি। তবে ১৩ জন গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
সীমিত পরিসরে বাজেট ঘোষণা করায় এবং কোনো কমিউনিটির প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকায় স্থানীয় সচেতন নাগরিক, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী যেকোনো বাজেট ঘোষণার পূর্বে উন্মুক্ত আলোচনা ও নাগরিক মতবিনিময় সভা আয়োজনের নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে পৌর কর্তৃপক্ষ ওইসব নিয়ম উপেক্ষা করে এবং কাউকে না জানিয়ে গোপনে ও সীমিত পরিসরে বাজেট ঘোষণা করায় সংকীর্ণতার পরিচয় দিয়েছে। উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা করলে সকলেরই উপকার হতো এবং আগামী দিনে পৌরসভার উন্নয়নে অংশীদার হওয়া যেত। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ থাকলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতো এবং নাগরিকদের চাহিদা পূরণে সহায়তা করত।
শ্রীপুর পৌর সচেতন নাগরিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন, “বাজেট ঘোষণার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কী বাজেট হয়েছে, তাও জানি না।” কমিউনিটি প্রতিনিধিদের না জানিয়ে গোপনে বাজেট ঘোষণা করায় এবারের বাজেট স্বচ্ছ হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
শ্রীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সহকারী অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, “আজকে যে বাজেট ঘোষণা হয়েছে, তা আমি জানি না। আমি মনে করি, পৌরসভার নাগরিক হিসেবে আমার অধিকার হরণ করা হয়েছে।”
শ্রীপুর পৌর বিএনপির সদস্যসচিব ও পৌরসভার মেয়রপ্রার্থী বিল্লাল হোসেন বেপারী বলেন, “বাজেট ঘোষণা হয়েছে, আমি জানি না। আমাকে কেউ দাওয়াতও দেয়নি। এটা আমাদের ব্যর্থতাও হতে পারে। আপনাদের (সাংবাদিকদের) মাধ্যমে শুনলাম। কী বাজেট দিয়েছে, তা আমি জানি না। আমি পৌরসভার নাগরিক হিসেবে বলব, পৌর কর্তৃপক্ষ যে বাজেট ঘোষণা করেছে, তা যেন পৌরসভার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং অবহেলিত মানুষের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ড্রেনেজব্যবস্থার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়।”
গাজীপুর জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক ও পৌরসভার মেয়রপ্রার্থী এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, “কোনো কমিউনিটির প্রতিনিধিকে না জানিয়ে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে, যা মোটেও ভালো হয়নি। নাগরিক হিসেবে আমাদের জানার অধিকার ছিল। সকল কমিউনিটির প্রতিনিধিকে নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে বাজেট ঘোষণা করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতো।”
শ্রীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও পৌরসভার মেয়রপ্রার্থী ডা. সফিকুল ইসলাম বলেন, “যেখানে সংসদে উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা হয়, সেখানে একদম কাউকে না জানিয়ে, বলা চলে একেবারেই গোপনে বাজেট ঘোষণা করা ঠিক হয়নি। পৌর নাগরিকদের ট্যাক্সের টাকায় পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন হয়। সেখানে পৌরসভার আগামী বাজেট কী, তা সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি জানি না। এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক।”
জামায়াতে ইসলামী মনোনীত শ্রীপুর পৌরসভার মেয়রপ্রার্থী ড. মুহাম্মদ হারুনুর রশীদ বলেন, “আজ পৌরসভার বাজেট ঘোষণা হয়েছে, এটা আমি জানি না এবং কেউ আমাকে জানায়নি। পৌর কর্তৃপক্ষ সংকীর্ণ মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে। পৌরসভার উন্নয়ন নিয়ে আমরা যারা ভাবছি, আমার মনে হয় সবারই প্রত্যাশা ছিল বাজেট অধিবেশনে আমাদের ডাকা হবে। আমরা আমাদের মতামত উপস্থাপন করব।”
বাজেট অনুষ্ঠানে কোনো কমিউনিটির প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পৌরসভার প্রশাসক ও শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাহিদ ভূঞা বলেন, “আমাদের কোনো জনপ্রতিনিধি নেই।” ‘আপনারা লুকোচুরি বাজেট কেন করলেন’— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যদি লুকোচুরি করতাম, তাহলে আপনাদেরকে (সাংবাদিক) দাওয়াত দিতাম না।”
বিগত বছরে আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ প্রায় ১২ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। ওই ১২ লাখ টাকা কোথায় খরচ করা হয়েছে— শ্রীপুর উপজেলা সাংবাদিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং দৈনিক আমার দেশের স্থানীয় প্রতিনিধি এস এম জহিরুল ইসলাম জানতে চাইলে পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস হাওলাদার বলেন, “বিভিন্ন সময় কেনাকাটার জন্য খরচ হয়। সেগুলোই আনুষঙ্গিক খরচ।” তার এমন উত্তরে পৌর প্রশাসক নাহিদ ভূঞা নির্দেশ দেন, এরপর থেকে প্রত্যেকটি খরচ যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে।
গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯২ কোটি ৯৭ লাখ ৫৯ হাজার ১৭৩ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ৪৪ কোটি ৯৯ লাখ ৯৮ হাজার ৯১৭ টাকা ৪৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এবারের বাজেটে নতুন কোনো কর আরোপ করা হয়নি।
কেকে/এলএ