ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিলে দিশেহারা মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কয়েক লাখ গ্রাহক। অন্যান্য মাসে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বিল এলেও জুন ও জুলাই মাসে তা বেড়ে গেছে প্রায় কয়েক গুণ। বিল বাড়লেও বাড়ছে না বিদ্যুৎ সেবার মান।
গ্রাহকদের অভিযোগ, সেবার মান বৃদ্ধি না করে জুন মাসকে টাকা কামানোর পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবছরই জুন মাসে অস্বাভাবিক বিলে দিশেহারা হয়ে পড়েন নিম্নআয়ের মানুষ। সেই সঙ্গে ঘনঘন লোডশেডিং তো নিত্যসঙ্গী। জুন মাস এলেই এমন অস্বাভাবিক বিল বৃদ্ধির যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে প্রতিটি অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তাদের।
তবে বিলের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে নানা যুক্তি দিচ্ছেন মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা। সেই সঙ্গে কেউ অভিযোগ করলে বিষয়টি বিবেচনার কথাও জানান তারা।
এদিকে মৌলভীবাজার জেলায় তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। এই গরমের তীব্র দাহকালে বিদ্যুতের লোডশেডিং যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। এই ভ্যাপসা গরমে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষজন। শহরাঞ্চলে বিদ্যুতের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ একবার গেলে আর আসে না। শহর-নগর থেকে গ্রাম-জনপদ—সর্বত্রই হঠাৎ এ বিদ্যুৎ সংকট। এ গরমে টিকে থাকা যেন কঠিন হয়ে পড়েছে। ঠিক এ সময়েই শুরু হয়ে গেছে অসহনীয় লোডশেডিং। এর কোনো শিডিউল নেই। ইচ্ছেমতো বিদ্যুৎ নিচ্ছে আর দিচ্ছে। দিন ও রাতে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ ও স্বাস্থ্যসেবাসহ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় একাধিকবার এবং রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে। প্রচণ্ড গরমে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। রাতের লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবারকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা বলেন, একদিকে এত গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন, অন্যদিকে এমন লোডশেডিংয়ের বিড়ম্বনা। দিনের বেলার লোডশেডিং মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু রাতের বেলার লোডশেডিং কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। লোডশেডিংয়ের বিড়ম্বনা থেকে মানুষ মুক্তি চায়। তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করেছেন মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই মাস ধরে পল্লী বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বিলে অতিষ্ঠ মৌলভীবাজার জেলার সাত উপজেলার কয়েক লাখ গ্রাহক। শ্রীমঙ্গল শহরতলীর রামনগর আবাসিক এলাকার পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক শাহানা আক্তার। জুন মাসের বিল হাতে পাওয়ার পর তার চোখ যেন কপালে উঠেছে। বিগত মাসগুলোতে নিয়মিত ৪০০ থেকে ৫৭৫ টাকা বিল পরিশোধ করলেও জুন মাসে তাঁর বিল এসেছে ১ হাজার ৬১২ টাকা। হঠাৎ কয়েক গুণ বেশি বিল দেখে হতবাক তিনি। গ্রাহক শাহানা বলেন, গত দুই মাস ধরে তিন গুণ বিল এসেছে। ৪৫০ টাকার বিল ১ হাজার ৬০০ টাকা এসেছে।
আশিদ্রোন ইউনিয়নের গাজিপুর গ্রামের গ্রাহক রহুল আমিন রুবেল বলেন, প্রতি মাসে আমার বাসার বিদ্যুৎ বিল আসত মাত্র ৮০০-৯০০ টাকা। বর্তমানে ১ হাজার ৮০০ থেকে প্রায় ২ হাজার টাকা বিল এসেছে।
কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর উসমানগড় দারুস সুন্নাহ মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুস শহিদ বলেন, বিগত মাসগুলোতে বিদ্যুৎ বিল ১৪ হাজার টাকা অতিক্রম করেনি। কিন্তু গত মাসে ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে।
রাজনগর উপজেলার কামারচাক এলাকার বাসিন্দা জাযেদ আল হাফিজ বলেন, ১ হাজার ২০০ টাকার বিল ২ হাজার ৮০০ টাকা এসেছে। কুলাউড়া উপজেলার কটারকোনার বাসিন্দা মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, ৭০০ টাকার বিল এখন ১ হাজার ৫০০ টাকা এসেছে। মৌলভীবাজার রোডের শেখ নোমান বলেন, গত কয়েক বছর ধরে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৬-৭ হাজার টাকা বিল আসত। এখন প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকার বিল এসেছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার বরুণা হাজীপুর চাইল্ড কেয়ার সেন্টারের প্রধান শিক্ষক আলী আহমদ বলেন, গত মাসের বিল ছিল ৭০০ টাকা। এ মাসের বিল এসেছে ১ হাজার ৮০০ টাকা। মৌলভীবাজার চৌমুহনা এলাকার বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, আগের মাসের বিল ছিল ৮৫০ টাকা, আর বর্তমান মাসের বিল এসেছে ২ হাজার ২০০ টাকা।
উপজেলার শাহীবাগ এলাকার বাসিন্দা ঈশিকা ইসা বলেন, যেখানে আগে ১ হাজার ৫০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসত, সেখানে এবার ৩ হাজার ৯০০ টাকা এসেছে। দুঃখের বিষয় হলো, গত মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় লোডশেডিংও বেশি হয়েছে।
ভৈরবগঞ্জ বাজার এলাকার ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম হুযাইফা বলেন, আমার যেখানে পল্লী বিদ্যুতের বিল গড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকা আসত, সেখানে এ মাসে এসেছে ৪ হাজার টাকা।
পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক মঈনুল ইসলাম বলেন, ২ হাজার টাকার বিলের জায়গায় দুই মাস ধরে বিল আসছে ৭ হাজার টাকা।
গ্রাহক আরিফ রব্বানী বলেন, গত কয়েক মাসে বিদ্যুৎ বিল ৪০০-৬০০ টাকার মধ্যে ছিল। কিন্তু জুলাই মাসে তিন গুণ বেড়ে ১ হাজার ৭০০ টাকা এসেছে।
সিন্দুরখান এলাকার বাসিন্দা পাভেল মাহমুদ বলেন, মে মাসে ৫০০, জুন মাসে ২ হাজার ৮০০ এবং জুলাই মাসে ৬ হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিল এসেছে।
মুসলিমবাগ এলাকার গ্রাহক আরিফ হোসেন বলেন, গত মাসগুলোতে ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা আসলেও এ মাসে ৭৭ হাজার ৮০০ টাকা এসেছে।
এভাবে মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলার অসংখ্য গ্রাহকের অভিযোগ, ভূতুড়ে বিলে পরিবারের ওপর চাপ বেড়েছে। তারা বলছেন, বিল নিয়ে অভিযোগ করে কোনো লাভ হচ্ছে না। গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুতের দাম বাড়লেও কমেনি ঘনঘন লোডশেডিং এবং বৃদ্ধি পায়নি সেবার মান।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, গত মাসে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং থাকলেও বিল কমার বদলে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এতে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারা এই অনুমাননির্ভর বিলের হয়রানি বন্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহির দাবিও জানিয়েছেন।
মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে মূলত ব্যবহারজনিত ও ট্যারিফ বৃদ্ধির কারণে। রিডিংয়ে যদি কোনো অসঙ্গতি থাকে, তাহলে ছবি তুলে আমাদের অফিসে নিয়ে এলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পল্লী বিদ্যুতের যেকোনো গ্রাহকের বিল বা রিডিংয়ে ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে তা অবশ্যই সমন্বয় করে দেওয়া হবে। লোডশেডিংয়ের বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। যার ফলে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুতই এর সমাধান হবে।
কেকে/ এমএস