কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রতিনিয়ত মায়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে চাষাবাদের সারসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে পাচার হওয়া মালামাল জব্দ করলেও কোনোভাবেই এই অবৈধ বাণিজ্য থামানো যাচ্ছে না। সীমান্ত দিয়ে এভাবে দেশের সম্পদ বাইরে চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে তীব্র সংকট ও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার টেকনাফ সীমান্ত এবং রামু উপজেলার দুর্গম গর্জনিয়া অঞ্চলকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে পাচারকারী চক্র। চক্রটি রাতের আঁধারে এবং বিভিন্ন কৌশলে শত শত বস্তা রাসায়নিক সার, ভোজ্যতেল, চিনি ও অন্যান্য নিত্যপণ্য ওপারে পাঠিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে সেখানে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকায় চড়া মূল্যের লোভে দেশের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই পাচারে লিপ্ত রয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় কৃষি সার পাচারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দুই দফা অভিযানে অন্তত অর্ধশতাধিক বস্তা সার আটক করেছেন বলে জানা গেছে। তাদের দাবি, এসব সার মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে পাচারের উদ্দেশ্যে সীমান্ত এলাকায় মজুদ করা হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি গয়ালমারা এলাকার সীমান্তসংলগ্ন আনজুমানপাড়া পথ দিয়ে সাত বস্তা সার পাচারের সময় স্থানীয়রা একটি চালান আটক করেন। অভিযোগ রয়েছে, সারগুলো রামু উপজেলা থেকে আনা হয়েছিল। একই সময়ে পশ্চিম পালংখালী এলাকায় পৃথক অভিযানে আরও ৫০ থেকে ৬০ বস্তা সার জব্দ করা হয়।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, চকরিয়া, ঈদগাঁও, রামু ও কক্সবাজার সদর এলাকা থেকে সার সংগ্রহ করে সীমান্তবর্তী স্থানে মজুদ করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে সেগুলো আরাকানে পাচারের চেষ্টা করা হয়। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন উপজেলা থেকে সার এনে উখিয়ার সীমান্ত এলাকায় জমা করছে এবং রাতের আঁধারে বা দুর্গম পথ ব্যবহার করে মিয়ানমারে পাচার করছে।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, কৃষকদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ করা সার পাচার হলে সরকারের অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি কৃষি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা অভিযোগ করেন, এক উপজেলার জন্য বরাদ্দকৃত সার অন্য উপজেলায় পরিবহনের বিধিনিষেধ থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না।
এলাকাবাসীর দাবি, জুন মাসে কক্সবাজার জেলায় প্রায় ৪২০ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার একটি অংশ পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশীষ সরকার বলেন, ‘সারসহ বিভিন্ন পণ্য আরাকানে পাচারের বিষয়টি আমাদের জানা আছে। সার পাচার রোধে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
তিনি জানান, জুন মাসে উখিয়া উপজেলার জন্য মাত্র ৬৭ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জব্দ হওয়া সার অন্য উপজেলা থেকে আনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয়দের জব্দ করা সার পরবর্তীতে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ‘সার পাচার ও সার জব্দের বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি। সারসহ সব ধরনের পণ্য মিয়ানমারে পাচার রোধ এবং এ-সংক্রান্ত অব্যবস্থাপনা বন্ধে তৎপরতা বাড়ানোর জন্য ৬৪ বিজিবি, কৃষি অফিসসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।’
সচেতন নাগরিকদের দাবি, সীমান্ত এলাকায় সারের অস্বাভাবিক মজুদ ও পরিবহন বিষয়ে দ্রুত তদন্ত এবং কক্সবাজার-উখিয়া সড়কের বিভিন্ন চেকপোস্টে কড়াকড়ি তল্লাশি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি উপকরণ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, সীমান্ত ও আশপাশের এলাকায় প্রায়ই ঝটিকা অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া, টিএসপিসহ বিভিন্ন প্রকার চাষাবাদের সার এবং খাদ্যসামগ্রী আটক করা হয়েছে। তবে ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং গুটিকয়েক স্থানীয় দালালের সহায়তায় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পাচার কার্যক্রম সচল রাখছে চোরাকারবারিরা।
এদিকে, প্রতিনিয়ত পণ্য পাচারের এই ঘটনায় চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের মতে, এভাবে দেশের সার ও নিত্যপণ্য ওপারে চলে গেলে দেশের বাজারে বড় ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে। ইতিমধ্যেই স্থানীয় বাজারে বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, চাষাবাদের ভরা মৌসুমে সারের তীব্র সংকট দেখা দিলে চরম ব্যাহত হবে কৃষি উৎপাদন।স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল সীমান্ত পাহারা বা সাময়িক অভিযান দিয়ে এই পাচার রোধ করা সম্ভব নয়। পাচারের পেছনে থাকা মূল হোতা ও সিন্ডিকেট চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে এই জাতীয় ক্ষতি এড়ানো যাবে না। দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নিলে জেলার বাজার পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেকে/ এমএস