কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার মহিষারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত মিড ডে মিলে সিদ্ধ ডিমের পরিবর্তে কাঁচা ডিম সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার (২৪ জুন) বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল বিতরণের সময় এ ঘটনা ঘটলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মসূচিতে এমন অনিয়মের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, সরকারের মিড ডে মিল কর্মসূচির আওতায় ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বনরুটি ও সিদ্ধ ডিম সরবরাহ করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের হাতে বনরুটির সঙ্গে ডিমও তুলে দেওয়া হয়। তবে পরে দেখা যায়, বিতরণ করা ডিমগুলো সিদ্ধ নয়, বরং কাঁচা। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে ডিম খেতে পারেনি। কেউ ডিম বাড়িতে নিয়ে যায়, আবার কেউ তা ফেলে দেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানায়, আমাদের বনরুটির সঙ্গে ডিম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ডিমগুলো সিদ্ধ ছিল না। কেউই ডিম খেতে পারেনি। পরে কেউ বাড়িতে নিয়ে গেছে, আবার কেউ ফেলে দিয়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, মিড ডে মিলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে এমন অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের দাবি, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলার কারণে তার সুফল থেকে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থী রুমাইসার মা রাবিয়া সুলতানা বলেন, ‘সরকার শিশুদের পুষ্টির কথা চিন্তা করে মিড ডে মিল চালু করেছে। সেখানে কাঁচা ডিম দেওয়া খুবই দুঃখজনক। আমার মেয়ে ডিমটি বাড়িতে নিয়ে এসেছে। পরে আমরা সিদ্ধ করে তাকে খেতে দিয়েছি। বিদ্যালয়ে যদি ঠিকমতো খাবার প্রস্তুত করে দেওয়া না হয়, তাহলে এই কর্মসূচির উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।’
স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই মিড ডে মিল বিতরণে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে। কখনো খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আবার কখনো নির্ধারিত মেনু অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করা হয় না। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে মিড ডে মিলের ঠিকাদার মহসিন বলেন, ‘মহিলাদের মাধ্যমে ডিম সিদ্ধ করে সরবরাহ করা হয়। সময়ের স্বল্পতার কারণে হয়তো ডিমগুলো সিদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। তবে শিক্ষার্থীদের কাঁচা ডিম দেওয়া উচিত হয়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সোহাগ বৈষ্ণব বলেন, ‘ঈদের ছুটির পর বিদ্যালয় খোলার পর থেকে যেসব দিনে ডিম দেওয়ার কথা ছিল, সেসব দিনই সিদ্ধ ডিমের পরিবর্তে কাঁচা ডিম দেওয়া হচ্ছে। আমাদের বিদ্যালয়ে ২৫৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত মিড ডে মিলের সুবিধা পেয়ে থাকে। বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।’
তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দানিসুজ্জামান জানান, তিনি বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। ফলে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করতে পারেননি।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মিড ডে মিল কর্মসূচির ঠিকাদার সরাসরি অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই এ বিষয়ে আমাদের সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কোনো অভিযোগ পেলে আমরা তা যথাযথভাবে অধিদপ্তরে অবহিত করি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করি।’
উল্লেখ্য, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টির ঘাটতি দূর করা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া রোধের লক্ষ্যে সরকার দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল কর্মসূচি চালু করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও তদারকির ঘাটতির অভিযোগ উঠলে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল মনে করছেন, শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্যসামগ্রী বিতরণে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে।
কেকে/ এমএস