মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় দখল, দূষণ ও বালু উত্তোলনের কারণে পাহাড়ি ছড়া ও নদীগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে। বেদখল হয়ে এবং পলি জমে বিভিন্ন ছড়া ও নদী সরু খালে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উপজেলার গোপলা নদী, বিলাস নদী ও ভূরভুরিয়া ছড়া পরিবেশগত সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত দখল ও বর্জ্য ফেলার ফলে অনেক জলধারা তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারানোর পথে।
সরেজমিন দেখা যায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলার অন্যতম নদী গোপলা। আশিদ্রোন, ভূনবীর, মির্জাপুর ও সদর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরস্রোতা এই নদীটি এখন গতিহারা। বালু আর পলিতে ভরাট হয়ে দিক বদল করেছে এই নদী। মূল নদীর জমি দখল কেউ গড়ে তুলেছেন মাছের খামার, বাসাবাড়ি, কেউ করেছেন ধান চাষ। কেউবা নদী ভরাট করে করেছেন যাতাযাতের রাস্তা। দীর্ঘদিন ধরে নদীর জায়গা দখল হতে থাকলেও জমি উদ্ধারে কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই। একইভাবে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী খনন করে পুরোনো গতি পথ ফেরাতেও কোনো প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে না। মরা নদীর দুই পাশের কৃষিজমি এখন পতিত পরে আছে।
পানির অভাবে হাওড়ের প্রায় ১১টি বিল বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের পথে রয়েছে আরও দুটি বিল। একই চিত্র বিলাস নদীরও। এছাড়া রাতের অন্ধকারে ও ভোরবেলায় ভূরভুরিয়া ছড়া, লাংলিয়া ছড়া ও বিলাস নদীর বিভিন্ন অংশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করার ফলে প্রকৃতি-পরিবেশ হুমকির মুখে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাস্তাঘাট, বসতভিটা, ব্রিজসহ স্থানীয় অবকাঠামো।
অন্যদিকে পৌর শহরের জালালিয়া রোড দক্ষিণ, কালিঘাট রোড এবং আশিদ্রোন ইউনিয়নের রামনগর, মুসলিমবাগ ও গাংপার এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ভুরভুরিয়া ছড়ার দুই পাড় দখল করে ভবন, দোকান এবং টিনশেড স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি খাসজমিতেও অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় ছড়ার প্রস্থ দিন দিন কমে যাচ্ছে।
এছাড়া বসত-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত ছড়ায় ফেলা হচ্ছে। এতে পানিদূষণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে পুরো এলাকায়। পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্য উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে।
ভানুগাছ রোড, জালালিয়া রোড, কালিঘাট রোড, রামনগর-গাজিপুর এলাকার বিভিন্ন অংশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এসব কার্যক্রমে নদী ও ছড়ার তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের অবকাঠামোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ছড়া দখল ও ভরাটের কারণে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না। ফলে উপজেলার আশিদ্রোন, উত্তর ভাড়াউড়া, রামনগর, গাজিপুর, সুনগইড়, সিন্দুরখান রোড ও আশপাশের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন ও পৌর প্রশাসন যৌথ অভিযান পরিচালনা করেছে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকনের নেতৃত্বে ভানুগাছ রোড, জালালিয়া রোড দক্ষিণ ও কালিঘাট রোড এলাকায় মঙ্গলবার (৩০ জুন) অভিযান চালিয়ে দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়গুলো পরিদর্শন করা হয়।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানান, ভূমি অফিসের মাধ্যমে ছড়ার সীমানা নির্ধারণ করে সব অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকন বলেন, ছড়া দখল করে বিভিন্ন লোক বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন যা প্রাথমিকভাবে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। শ্রীমঙ্গল পৌরসভা হতে ছড়ার সীমানা চিহ্নিত করে অবৈধ দখলদারদেও বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ গ্রহন করা হবে। এছাড়া নদী-ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে জড়িত অসাধু বালু ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার প্রশাসক ও ইউএনও মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ছড়া ও সরকারি জমি দখল, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং জলাশয়ে বর্জ্য ফেলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় নাগরিকদের সচেতন হওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
কেকে/ এমএস