মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: আবারও কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কত?      দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষা, দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড়      হরমুজকে ঘিরে উত্তেজনা, ইরানে রাতভর মার্কিন হামলা      স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধন কমিটি, বিরোধীদের ওয়াকআউট      তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা      ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নে রাষ্ট্রের নতুন সামাজিক চুক্তি
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪৪ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই সাধারণত বাজারে ভেজাল, রাসায়নিক মিশ্রণ, নিম্নমানের পণ্য কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের প্রসঙ্গ সামনে আসে। সংবাদপত্রের শিরোনামে থাকে ভেজাল দুধ, বিষাক্ত ফল, কৃত্রিম রং মেশানো মসলা কিংবা নকল খাদ্যপণ্যের খবর। কিন্তু নিরাপদ খাদ্যের প্রকৃত সংকট কি কেবল বাজারে? নাকি এর শিকড় আরও গভীরে—কৃষিজমিতে, কৃষিনীতিতে, মাটির স্বাস্থ্যে, কৃষকের জীবনে এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শনে? এ প্রশ্নের মুখোমুখি না দাঁড়ালে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সব উদ্যোগই আংশিক থেকে যাবে। কারণ নিরাপদ খাদ্য কখনোই কেবল ভোক্তার থালার বিষয় নয়; এটি বীজ থেকে বাজার পর্যন্ত একটি সমন্বিত বাস্তুতান্ত্রিক, জনস্বাস্থ্যগত এবং ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থার নাম।

সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভেজালবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তবে এ উদ্যোগ তখনই অর্থবহ হবে, যখন রাষ্ট্র উপলব্ধি করবে যে নিরাপদ খাদ্যের লড়াই আসলে ভেজালবিরোধী অভিযান নয়; এটি কৃষিনীতি, জনস্বাস্থ্যনীতি, পরিবেশনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সম্মিলিত লড়াই। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, কৃষক, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তার পারস্পরিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। এ দায়বদ্ধতার নতুন কাঠামোকেই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ‘সামাজিক চুক্তি’র নতুন রূপ হিসেবে দেখে। একটি রাষ্ট্র তার নাগরিককে কী ধরনের খাদ্য দিচ্ছে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই খাদ্য উৎপাদনকারী মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ।

বাংলাদেশের কৃষক আজ এমন এক বৈপরীত্যের মধ্যে বাস করছেন, যেখানে তিনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি, অথচ নিজেই সবচেয়ে অনিরাপদ পেশাজীবীদের একজন। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান, সবজি, মাছ, হাঁস-মুরগি—বহু ক্ষেত্রেই উৎপাদন বেড়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের এ পরিসংখ্যানের আড়ালে একটি প্রশ্ন ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে—আমরা কি শুধু বেশি খাদ্য উৎপাদন করেছি, নাকি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করেছি?

এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ উৎপাদন বৃদ্ধির যে মডেল আমরা অনুসরণ করেছি, তার ভিত্তি গড়ে উঠেছে উচ্চফলনশীল জাত, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, আগাছানাশক, ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর সেচ এবং ক্রমবর্ধমান বাজারনির্ভর কৃষির ওপর। এই মডেল স্বল্পমেয়াদে উৎপাদন বাড়িয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং কৃষকের স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে—সে প্রশ্ন তুলতে আমরা দীর্ঘদিন অনিচ্ছুক ছিলাম। আজ সেই প্রশ্ন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বড় অনুপস্থিত চরিত্রটি কৃষক। অথচ মাঠে দাঁড়িয়ে কীটনাশক ছিটানো মানুষটির শরীরেই প্রথম রাসায়নিকের অভিঘাত এসে পড়ে। ২০২১ সালে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা যায়, হাসপাতালে ভর্তি প্রতি ১০০ জন পুরুষ ক্যানসার রোগীর মধ্যে প্রায় ৬৪ জন কোনো না কোনোভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। নারী-পুরুষ মিলিয়ে কৃষি পেশায় যুক্ত মানুষের হারও উল্লেখযোগ্য। এ তথ্য থেকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক টানা বৈজ্ঞানিকভাবে সমীচীন নয়। কারণ ক্যানসার একটি বহুমাত্রিক রোগ; এর পেছনে বংশগত, পরিবেশগত, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপনসহ বহু কারণ কাজ করে। কিন্তু এটিও সত্য যে দীর্ঘদিন কীটনাশক, রাসায়নিক সার এবং অন্যান্য কৃষি রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো ধারাবাহিকভাবে সতর্ক করছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সমস্যা আরও জটিল। অধিকাংশ কৃষক ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া কীটনাশক স্প্রে করেন। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত মাত্রা, সময় বা নিরাপত্তাবিধিও মানা হয় না। ব্যবহৃত রাসায়নিকের প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। ফলে কৃষক শুধু উৎপাদক নন; তিনি একই সঙ্গে ঝুঁকির প্রথম শিকার।

এখানেই নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নটি জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে রূপ নেয়। বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন ‘ওয়ান হেলথ (One Health)’ ধারণার ওপর জোর দিচ্ছেন। এ ধারণার মূল কথা হলো—মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে আলাদা করে দেখা যায় না। মাটি অসুস্থ হলে খাদ্য অসুস্থ হবে; খাদ্য অসুস্থ হলে মানুষও সুস্থ থাকবে না। আবার প্রাণিসম্পদে অযাচিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেই প্রতিরোধক্ষম জীবাণুর জন্ম দেয়।

বাংলাদেশের কৃষিনীতি এখনো এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, পানি ও বাণিজ্য—প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজস্ব কাঠামোয় কাজ করছে। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে এই বিচ্ছিন্নতা ভাঙতেই হবে। কৃষি নিয়ে আমাদের আলোচনায় সবচেয়ে কম উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি—মাটির স্বাস্থ্য। কিন্তু সত্য হলো, মাটি সুস্থ না থাকলে নিরাপদ খাদ্যও সম্ভব নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দেশের অধিকাংশ কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমছে, প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি বাড়ছে এবং অনেক এলাকায় জিংকের ঘাটতি উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক গবেষণায় ধান ও সবজিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি, ভূগর্ভস্থ পানিতে নাইট্রেট বৃদ্ধির তথ্যও উঠে এসেছে। কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, ফসফেট, কীটনাশক ও শিল্পদূষণের সম্মিলিত প্রভাব ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা বহন করছে।

মাটি কেবল উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। সেখানে কোটি কোটি অণুজীব, কেঁচো, ছত্রাক ও অদৃশ্য প্রাণের সমন্বয়ে উর্বরতা তৈরি হয়। আমরা যখন অতিমাত্রায় রাসায়নিকের ওপর নির্ভর করি, তখন শুধু একটি ফসল নয়, একটি সম্পূর্ণ জীবন্ত ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিই। এ কারণে আধুনিক কৃষিবিজ্ঞান এখন উৎপাদনের পাশাপাশি মাটির পুনর্জীবন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পুনরুজ্জীবনমূলক কৃষির ওপর জোর দিচ্ছে।

নিরাপদ খাদ্যের আলোচনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো—আমরা সমস্যার শেষ প্রান্তটি দেখি, শুরুটা দেখি না। বাজারে ভেজাল ধরা পড়লে আমরা অভিযান চালাই, জরিমানা করি, কখনো কখনো কারাদণ্ডও দিই। কিন্তু যে উৎপাদনব্যবস্থা ধীরে ধীরে খাদ্য, মাটি, পানি এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তাকে খুব কমই প্রশ্ন করি। এ কারণেই নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আমাদের নীতিগত আলোচনাকে বাজারকেন্দ্রিকতা থেকে উৎপাদনকেন্দ্রিকতায় নিয়ে যেতে হবে।

আইনগত দিক থেকে বাংলাদেশ একেবারে পিছিয়ে নেই। নিরাপদ খাদ্য আইন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই এবং খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন বিধিবিধান বিদ্যমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক প্রবিধানও প্রণীত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন প্রণয়ন এবং আইন প্রয়োগের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিদর্শক নেই, আধুনিক পরীক্ষাগারের সংখ্যা সীমিত, নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা অপর্যাপ্ত এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ও দুর্বল। ফলে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য শনাক্ত করার যে ব্যবস্থা থাকা উচিত, তা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়ে ওঠে না।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) দেশের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য উৎপাদকদের বড় একটি অংশ এখনো মান নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন কিংবা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে পর্যাপ্ত সহায়তা পায় না। শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে মূল্যবান শিক্ষা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাদ্য নিরাপত্তা এখন ‘ফার্ম টু ফর্ক’ নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ বীজ থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ একই নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে বিবেচিত হয়। জাপান খাদ্যের উৎস শনাক্তকরণে উন্নত ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। জার্মানি খাদ্য, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে সমন্বিত নীতির আওতায় এনেছে। ভিয়েতনাম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, নিরাপদ উৎপাদন এবং রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্যের মান উন্নয়নের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের জন্য এসব মডেল হুবহু অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এগুলোর মূল শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—নিরাপদ খাদ্য কেবল আইন দিয়ে নিশ্চিত হয় না; এটি নিশ্চিত হয় বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কৃষকবান্ধব সহায়তা এবং জবাবদিহিমূলক শাসনের মাধ্যমে।

মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একটি অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কের মধ্যে দেখার ধারণাটি আজ বিশ্ব স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম ভিত্তি। কৃষিতে নির্বিচারে কীটনাশক, প্রাণিসম্পদে অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, দূষিত পানি কিংবা মাটির অবক্ষয়—এসবের প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেই ফিরে আসে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, পানি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।

এই বাস্তবতায় কেবল উদ্বেগ প্রকাশ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিগত সংস্কার। এজন্য কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণও জরুরি।

প্রথমত, কৃষিতে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জৈব সার এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতিটি বিভাগে আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার এবং জেলা পর্যায়ে মানসম্মত পরীক্ষার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু করে খাদ্যের উৎস শনাক্তকরণ সহজ করতে হবে। পঞ্চমত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল—বিশেষত হাওর, উপকূল ও চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য কার্যকর ফসলবিমা, ঝুঁকি ভাতা এবং অভিযোজন তহবিল গঠন করতে হবে।

একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্যকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা, গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা উৎসাহিত করা, ভোক্তা সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্ভব নয়।

ব্যবসায়ীদেরও মনে রাখতে হবে, লাভ ব্যবসার লক্ষ্য হতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্য কখনোই সেই লাভের মূল্য হতে পারে না। খাদ্যে ভেজাল দিয়ে অর্জিত অর্থ আসলে সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতা থেকে চুরি করা সম্পদ।

অন্যদিকে ভোক্তারও দায়িত্ব রয়েছে। শুধু কম দাম বা বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যের প্রতি সচেতন চাহিদা তৈরি করতে হবে। কারণ সচেতন ভোক্তা একটি দায়িত্বশীল বাজার তৈরি করে।

সবশেষে একটি মৌলিক সত্য আমাদের মনে রাখতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, কোনো মৌসুমি অভিযানও নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনের অংশ। যে রাষ্ট্র নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্রের উন্নয়নের দাবিও অপূর্ণ থেকে যায়। আমাদের আরও মনে রাখতে হবে, নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়, কোনো রাজনৈতিক স্লোগানও নয়। এটি সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মৌলিক অধিকার। যে দিন রাষ্ট্র এই সত্যকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রস্থলে স্থান দেবে, সেদিনই নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নে আমাদের নতুন সামাজিক চুক্তির সূচনা হবে। আর সেই চুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে—সুস্থ কৃষক, সুস্থ মাটি, সুস্থ পরিবেশ এবং সুস্থ মানুষ। যে রাষ্ট্র কৃষকের স্বাস্থ্য, মাটির উর্বরতা ও নাগরিকের নিরাপদ খাদ্যকে একই নীতির অংশ হিসেবে দেখে, ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রই নিশ্চিত করতে পারে। নতুন সামাজিক চুক্তির প্রকৃত ভিত্তিও সেখানেই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  সামাজিক চুক্তি   নিরাপদ খাদ্যে  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close