মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বন্যপ্রাণীদের অকৃত্রিম বন্ধু সীতেশ রঞ্জন দেব (৭৫) আর নেই।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সীতেশ রঞ্জনের নাতি রাজদ্বীপ দেব জানান, সকালে হঠাৎ করে সীতেশ রঞ্জনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রওয়ানা দেন। তবে পথেই তার মৃত্যু হয়।
মারা যাওয়ার পর মরদেহ তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে নিয়ে রাখা হয়। সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পরে মরদেহ রামকৃষ্ণ মিশন সড়কের বাসভবনে নিয়ে আসা হয়। পরে দুপুর ২টার দিকে তার পৈত্রিক বাড়ি শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁও গ্রামে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে, বন্ধু সীতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান, উপজেলা সহকারী কমিশন (ভূমি) মুহিবউল্লাহ আকন, শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাব, বীর মুক্তিযুদ্ধা আবু শহীদ আব্দুল্লাহসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
সীতেশ রঞ্জন দেব দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি প্রায় অর্ধ শতাব্দির বেশি সময় ধরে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, বন ছেড়ে নানা কারণে লোকালয়ে আসা বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সেবা, চিকিৎসা, পুনর্বাসনে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। এছাড়া তিনি তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বন্যপ্রাণীদের লোকালয় থেকে উদ্ধারের পর পুনরায় বনাঞ্চলে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি প্রাণী হত্যা রোধ, পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণসহ পরিবশের নানা বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের পরিচিত মুখ সীতেশ রঞ্জন দেব ‘সীতেশ বাবু’ নামেও পরিচিত ছিলেন।
সীতেশ রঞ্জন দেব শুধু একটি নাম নন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের এক অনন্য প্রতীক। আহত, অসুস্থ কিংবা বিপন্ন বন্য প্রাণীদের আশ্রয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে তার অবদান দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লোকালয়ে ঢুকে মানুষের হাতে নির্যাতিত, বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে আহত, অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম কিংবা পাচারকারীদের কবল থেকে উদ্ধার হওয়া অসংখ্য বন্য প্রাণীর শেষ ভরসার জায়গা ছিল শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইট-পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সিতেশ বাবুর দীর্ঘ কয়েক দশকের শ্রম, ত্যাগ ও ভালোবাসা।
শুধু চিকিৎসাই নয়, সুস্থ হয়ে ওঠা প্রাণীগুলোকে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি বন্য প্রাণী হত্যা ও পাচার রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ ও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তার উদ্যোগে হাজারো মানুষ বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন।
গত কয়েক দশকে তার হাতে চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হয়ে প্রকৃতিতে ফিরে গেছে হাজার হাজার বন্য প্রাণী। দেশের বন বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন বন্য প্রাণী উদ্ধারকারী সংগঠন ও সাধারণ মানুষ লোকালয়ে বণ্যপ্রাণী দেখলেই ভরসা করতেন সিতেশ বাবুর ওপর। মৃত্যুর আগে তার দুই ছেলেকে তৈরি করে গেছেন বন্যপ্রাণীর সেবায় নিয়জিত থাকতে। সীতেশ রঞ্জন দেব অসুস্থ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে তার ছেলে সজল দেব ও সঞ্জিত দেব বাবার অনুপ্রেরণায় বন্যপ্রাণী উদ্বারে কাজ করে যাচ্ছেন।
সিতেশ বাবুর চলে যাওয়া বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তার হাতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান এবং তাঁর আদর্শই ভবিষ্যতে এই কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন তার সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও অসংখ্য প্রকৃতিপ্রেমী।
সিতেশ রঞ্জন দেবের শেষ বিদায়ের সংবাদে শ্রীমঙ্গলে শোকের ছায়া নেমেছে। প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায় জানাতে এসে অনেকেই অশ্রুসজল চোখে স্মরণ করেন তার মানবিকতা ও নিরলস কর্মযজ্ঞকে।
কেকে/এমএ