মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ শিক্ষামন্ত্রীর      সংসদ ভবনের সামনে পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া      প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর সংসদ ভবনে জরুরি বৈঠক      সাইন্সল্যাব থেকে সংসদ অভিমুখে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা      শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও অবরোধে স্থবির রাজধানী      শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরার আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর      পরীক্ষা স্থগিত ও শিক্ষামন্ত্রীর পতদ্যাগ দাবি পরীক্ষার্থীদের, বৈঠকে কর্মকর্তারা      
দেশজুড়ে
বন্যায় কান্না আর ধ্বংসস্তূপে পরিণত কক্সবাজার
মো. নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৯:০৪ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

টানা নয় দিনের ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের তাণ্ডব শেষে কক্সবাজারের প্লাবিত এলাকার পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে উঠছে চারপাশের লণ্ডভণ্ড চিত্র। বন্যাকবলিত বিস্তীর্ণ জনপদ এখন কেবলই কাদা, কান্না আর ধ্বংসস্তূপে পরিণত। 

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই বন্যায় জেলার মৎস্য, কৃষি, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে আনুমানিক হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা চূড়ান্ত তালিকায় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

এবারের দুর্যোগে জেলাজুড়ে বন্যা, পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে অন্তত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৫ জনই রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা। ধ্বংসস্তূপে গৃহহীন হাজারো পরিবার বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতভিটায়। 

চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, রামু ও মহেশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়িঘর থেকে পানি নেমে গেলেও ঘরের ভেতর জমে আছে হাঁটুসমান কাদা। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে অনেকের ঘরের দেয়াল ধসে গেছে, আবার কারও উড়ে গেছে টিনের চালা।আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য, কাপড়চোপড় এবং সন্তানদের শিক্ষাসামগ্রী হারিয়ে কাদা-মাটির ওপর দাঁড়িয়ে এখন কেবলই কাঁদছেন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফেরা মানুষগুলো। মৎস্য খাতে ৪৬ কোটি টাকার ওপর ক্ষতিজেলার অর্থনীতি ও মৎস্য চাষে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বন্যায় মৎস্য খাতে প্রাথমিকভাবে ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।জেলার ১০টি উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। পানিতে ভেসে গেছে ১ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে উখিয়া উপজেলায়, যেখানে প্রায় ১৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকার মৎস্যসম্পদ নষ্ট হয়েছে। লণ্ডভণ্ড কৃষি ও ফসলের মাঠমাঠের পর মাঠ ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে থাকায় ধ্বংস হয়ে গেছে কৃষকের স্বপ্ন। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, জেলায় ১০ হাজার ৪০১ একর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে সরাসরি লোকসানের মুখে পড়েছেন ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক। এর মধ্যে ৬ হাজার ৪৭২ একর আউশ ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ৯১৪ একর আমনের বীজতলা এবং ২ হাজার ৩৫৯ একর শাকসবজির ক্ষেত পচে গেছে। এছাড়া চকরিয়া ও রামু এলাকায় পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সড়ক ও বেড়িবাঁধ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে জেলার প্রধান দুটি নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ৪৪টি স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। 

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যার পানির তোড়ে জেলার প্রায় ২ কিলোমিটার গ্রামীণ ও পাকা সড়ক এবং ৭৯টি ব্রিজ ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে, যার ফলে অনেক এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও বিচ্ছিন্ন। পেকুয়া ও কুতুবদিয়ায় ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে উখিয়ায়। এরপর রয়েছে মহেশখালী, চকরিয়া, মাতারবাড়ী, টেকনাফ ও সদর উপজেলা

চকরিয়ার কৃষক মো. গফুর নিজের জমির দিকে তাকিয়ে নির্বাক। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে জমিতে বাতাসে দুলছিল সবুজ আউশ ধান, সেখানে এখন কাদা আর পলির স্তূপ। পাশের গ্রামের মাছচাষি শাহাবুদ্দিন ভেঙে যাওয়া ঘেরের পাড়ে দাঁড়িয়ে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছেন। কয়েক ঘণ্টার পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে ১০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের মাছ। আর উখিয়ার হলদিয়াপালংয়ের গৃহবধূ ইসমত আরা ভেঙে পড়া টিনের ঘরের পাশে দুই সন্তানকে নিয়ে বসে আছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। মাথার ওপর ছাদ নেই, ঘরে খাবার নেই, সামনে কী অপেক্ষা করছে, সেই উত্তরও অজানা। এ তিনটি দৃশ্য আলাদা তিনটি পরিবারের নয়, এ বারের বন্যায় বিধ্বস্ত কক্সবাজারের সামগ্রিক চিত্র।

ঘর হারিয়েছে হাজারো পরিবার

বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে মানুষের বসতভিটায়। জেলায় ৬৬৮টি বসতঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে এবং আরও ১৫ হাজার ৮৫০টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে নষ্ট হয়েছে খাদ্যশস্য, আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, শিক্ষাসামগ্রী ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র।

পানি নেমে গেলেও বহু ঘরে এখনও হাঁটুসমান কাদা। কোথাও দেয়াল ধসে গেছে, কোথাও উড়ে গেছে টিনের চালা। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে অনেক পরিবার এখনও নিজেদের ঘরে বসবাস শুরু করতে পারেনি।
 
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, আমনের বীজতলা নষ্ট হওয়ায় আগামী মৌসুমের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত বীজ, সার ও প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষিদের সহায়তা দেওয়া হবে।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘দুর্গত এলাকায় এ পর্যন্ত ২৯৮ টন চাল এবং ৭,৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। তবে বিশাল এই ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি এবং পুনর্বাসনের জন্য সরকারের কাছে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।’

অবকাঠামো ক্ষতি, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

বন্যায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট, সেতু, সংযোগ সড়ক ও প্রতিরক্ষা বাঁধ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও রাস্তা ধসে গেছে, কোথাও সেতুর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে অসংখ্য নলকূপ। বিশুদ্ধ পানির সংকটে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। বহু বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।

আট দিনে ৮২৩ মিলিমিটারের কাছাকাছি বৃষ্টি

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, ৪-১১ জুলাই পর্যন্ত আট দিনে জেলায় ৮২০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জুলাই সর্বোচ্চ ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এছাড়া ৬ জুলাই ১২৯, ৮ জুলাই ১২৫, ১১ জুলাই ১১৫, ৯ জুলাই ৯৯, ৭ জুলাই ৬৯, ৪ জুলাই ২৮ এবং ১০ জুলাই ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ১২ জুলাইও বৃষ্টি অব্যাহত ছিল।
 
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যোগ হয়েছে মানবসৃষ্ট সংকট

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘হাজার কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ। কিন্তু যে স্বপ্ন ভেঙেছে, যে ঋণের বোঝা বেড়েছে, যে শিশুদের পড়াশোনা থেমে গেছে, আর যে কৃষক ও মাছচাষিরা আবার শূন্য থেকে শুরু করতে বাধ্য হচ্ছেন, তার মূল্য কোনো পরিসংখ্যানে ধরা সম্ভব নয়।’

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বন্যা   কান্না   ধ্বংসস্তূপ   কক্সবাজার  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close