বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য : প্রধানমন্ত্রী      রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে যা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      পদত্যাগের আভাস রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের      ট্রাইব্যুনালে জিয়া হত্যা মামলার আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর      ভর্তুকির সার পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে      জ্বালানি তেল নিয়ে ফের গুজবের পাঁয়তারা      ভিডিওকাণ্ডে জামায়াত থেকে বহিষ্কার এমপি গাজী নজরুল ইসলাম      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
এআইয়ের যুগে কেন ব্র্যান্ড পণ্য নয়, অনুভূতি বিক্রি করে?
নিশীথ শামীম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫১ পিএম আপডেট: ২৩.০৭.২০২৬ ৬:৩২ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

একসময় একটি ভালো পণ্য তৈরি করাই ব্যবসায়িক সফলতার প্রধান শর্ত ছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে একটি ভালো পণ্যই যথেষ্ট নয়। বাজারে প্রতিযোগিতা যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে মানুষের মনোযোগের মূল্য। আজকের ভোক্তা কেবল একটি পণ্য কেনেন না! তিনি একটি অভিজ্ঞতা, একটি গল্প, একটি মূল্যবোধ এবং একটি পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে আর্ট, ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিং- যা এখন ব্যবসায়ের পরিপূরক নয়, বরং প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

পণ্য নয়, অনুভূতির বাজার

বিশ্বের সবচেয়ে সফল ব্র্যান্ডগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে- তারা পণ্য বিক্রির আগে অনুভূতি তৈরি করে। কারণ ভোক্তার সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তি দিয়ে পরিচালিত হয় না; আবেগ, স্মৃতি, বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ও সেই সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
 
আপনি যখন `অ্যাপল’-এর একটি ডিভাইস ব্যবহার করেন, তখন কেবল একটি প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার করেন না।  আপনি নিজেকে একটি নির্দিষ্ট জীবনধারা, নান্দনিকতা এবং সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করেন। `অ্যাপল’-এর বিজ্ঞাপন খুব কমই প্রসেসর বা প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য দিয়ে শুরু হয়। বরং তারা দেখায়- প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের সৃজনশীলতা, সম্ভাবনা এবং জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে, লাইফ স্টাইলের সাথে স্ট্যাটাস বাড়ায়!
একইভাবে নাইকি তাদের জুতা বিক্রি করে না, তারা বিক্রি করে আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং সীমা অতিক্রম করার মানসিকতা। তাদের বিখ্যাত বার্তা ‘জাস্ট ডু ইট’ একটি বিজ্ঞাপনী স্লোগানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।  এটি একটি মানসিক অবস্থান (মাইন্ড সেট), যা কোটি মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

আর্ট ও ব্র্যান্ডের প্রথম ভাষা

একটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে মানুষের প্রথম পরিচয় ঘটে চোখের মাধ্যমে। রঙ, টাইপোগ্রাফি, ফটোগ্রাফি, ভিডিও, প্যাকেজিং, ডিজাইন, সঙ্গীত কিংবা গল্পে- সবই আর্টের অংশ। এই উপাদানগুলোই প্রথমে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে তার মনে একটি স্থায়ী ছাপ তৈরি করে।
 
ব্র্যান্ডিংয়ের ভাষায় বলা হয়, ‘পিপল ডোন্ট রিমেম্বার ইনফরমেশন; দে রিমেম্বার এক্সপেরিয়েন্সেস।’ অর্থাৎ, মানুষ তথ্যের চেয়ে অভিজ্ঞতাকে বেশি মনে রাখে। তাই একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বিজ্ঞাপন নয় বরং তার সৃষ্টি করা অনুভূতি! 

মার্কেটিংয়ে শিল্পের কৌশলগত ব্যবহার

আর্ট মানুষের আবেগ তৈরি করে কিন্তু সেই আবেগকে ব্যবসায়িক সাফল্যে রূপান্তরিত করে চলচ্ছে মার্কেটিং। কোকা-কোলার বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা খুব কমই পানীয়ের স্বাদ নিয়ে কথা বলে বরং পরিবার, উৎসব, বন্ধুত্ব এবং আনন্দের মুহূর্তকে কেন্দ্র করেই তাদের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। ফলে কোকা-কোলা একটি পানীয়ের সীমা ছাড়িয়ে আনন্দ ভাগাভাগির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে স্টারবাকস শুধু কফি বিক্রি করে না তারা একটি পরিবেশ, একটি অভ্যাস এবং একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করে। একইভাবে হাতিল আসবাবপত্র বিক্রির পাশাপাশি মানুষের জীবনযাপনকে নতুনভাবে কল্পনা করার সুযোগ দেয়। এই ব্র্যান্ডগুলো প্রমাণ করেছে সফল মার্কেটিং মানে শুধু প্রচার নয় বরং শিল্প, মনস্তত্ত্ব এবং ব্যবসায়িক কৌশলের সমন্বয়।

নিউরোমার্কেটিংয়ে কেন অনুভূতি বিক্রি হয়? 

আধুনিক নিউরোমার্কেটিং গবেষণা দেখায়, মানুষের অধিকাংশ ক্রয় সিদ্ধান্ত পুরোপুরি যুক্তিনির্ভর নয়। মস্তিষ্কের আবেগ-নিয়ন্ত্রিত অংশ অনেক ক্ষেত্রেই সচেতন বিশ্লেষণের আগেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে। গবেষকদের মতে ৯৫ শতাংশ প্রোডাক্ট সেলস হয় অবচেতন মনে আর ৫ শতাংশ সচেতন মনে বা যুক্তিনির্ভর- চৌকশ ব্র্যান্ড মাস্টারগণ সেই ৯৫ শতাংশ অবচেতন মন নিয়েই বেশি কাজ করে । 
 
এই কারণেই একটি বিজ্ঞাপনের সঙ্গীত, রঙ, মুখের অভিব্যক্তি কিংবা একটি সাধারণ গল্প অনেক সময় দীর্ঘদিন মানুষের মনে থেকে যায়। যেমন গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপন- স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার, স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার। মজার বিষয় হলো যখন একজন গ্রাহক নতুন সিম কেনার মাইন্ড সেট নেয় - সেই মুহুর্তে- সেই স্মৃতি (স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার) এবং অনুভূতিই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তাই বর্তমান সময়ে ব্র্যান্ডিং মানেই শুধু তথ্য প্রদান নয়; বরং একটি আবেগীয় অভিজ্ঞতা নির্মাণ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত

বিশ্বজুড়ে এখন আর্ট এবং ব্র্যান্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে এআই। একসময় একটি বিজ্ঞাপনের ধারণা থেকে শুরু করে ভিজ্যুয়াল, ভিডিও কিংবা কনটেন্ট তৈরি করতে বড় দল, দীর্ঘ সময় এবং বিপুল ব্যয়ের প্রয়োজন হতো। আজ এআই সেই প্রক্রিয়াকে দ্রুততর, আরও দক্ষ এবং অনেক বেশি পরীক্ষামূলক করে তুলেছে।
 
এআই এখন শুধু ছবি বা লেখা তৈরি করছে না এটি ভোক্তার আচরণ বিশ্লেষণ করছে, ব্যক্তিভেদে বিজ্ঞাপনের ভাষা পরিবর্তন করছে, বিভিন্ন ডিজাইন পরীক্ষা করছে এবং কোন ভিজ্যুয়াল বা বার্তা বেশি কার্যকর হবে, তা আগেই অনুমান করতে সাহায্য করছে। ফলে ব্র্যান্ডগুলো এখন আরও দ্রুত নতুন ধারণা পরীক্ষা করতে পারছে এবং তথ্যনির্ভর সৃজনশীল সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হচ্ছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট- এআই কখনো শিল্পীর কল্পনাশক্তির বিকল্প নয় বরং তার সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার একটি শক্তিশালী সহযাত্রী। ভবিষ্যতের সেরা ব্র্যান্ড হবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা প্রযুক্তির গতি এবং মানুষের সৃজনশীলতাকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারবে।

বাংলাদেশের ব্র্যান্ডগুলোর জন্য নব দিগন্ত 

বাংলাদেশের ব্র্যান্ডগুলোর জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। শুধু প্রতিযোগিতামূলক মূল্য বা ভালো পণ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড গড়ে তোলা কঠিন। স্থানীয় সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন, গল্প, নান্দনিকতা এবং প্রযুক্তিকে একত্রে ব্যবহার করে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড পরিচয় তৈরি করতে হয়।
 
বিশ্ববাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোকেও আর্ট, মনস্তত্ত্ব, তথ্যনির্ভর মার্কেটিং এবং এআইনির্ভর সৃজনশীলতাকে ব্যবসায়িক কৌশলের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু পণ্যের নয়, প্রযুক্তি আর সৃজনশীলতার।

একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড কখনো কেবল তার পণ্যের গুনের শক্তিতে মানুষের মনে জায়গা করে নেয় না। সে জায়গা তৈরি হয় শিল্পের নান্দনিকতা, গল্পের শক্তি, মানুষের আবেগ এবং কৌশলগত মার্কেটিংয়ের সমন্বয়ে। আর আজ সেই সমন্বয়কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বাজার বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, ভোক্তার আচরণও বদলাচ্ছে। কিন্তু একটি সত্য অপরিবর্তিত- মানুষ পণ্য ব্যবহার করে, কিন্তু অনুভূতি মনে রাখে। যে ব্র্যান্ড শিল্প, প্রযুক্তি ও মানবিক আবেগকে একই সুতোয় গাঁথতে পারবে, ভবিষ্যতের বাজারে নেতৃত্বও তার হাতেই থাকবে।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  এআইয়ের যুগ   ব্র্যান্ড   পণ্য   অনুভূতি বিক্রি করা   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close