সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড : হাসিনাসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল      জাতিসংঘে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্স, প্রচণ্ড বাকযুদ্ধ      বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-নারিতা ফ্লাইট ফের শুরু      পাউরুটিতে ক্যানসারের উপাদান ‘পটাশিয়াম ব্রোমেট’ ব্যবহার বন্ধে রিট      চট্টগ্রামে চাঁদা না পেয়ে আরেক ব্যবসায়ীর ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও বিস্ফোরণ      হামে আরও চার শিশুর মৃত্যু      গুলশানের বাসায় ফিরলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন      
খোলাকাগজ স্পেশাল
বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩০ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষা, নানা জটিলতা আর বারবার পিছিয়ে যাওয়া পরিকল্পনার পর অবশেষে বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক প্রকল্পগুলোর একটি-চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠতে যাওয়া এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হচ্ছে আজ সোমবার। 

প্রকল্প এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাওয়া এই উদ্যোগকে শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে।

কৌশলগত অবস্থানে গড়ে উঠছে শিল্পনগরী

আনোয়ারার গহিরা ও বৈরাগ ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠছে চায়নিজ ইকোনমিক জোন। প্রকল্পটির অন্যতম বড় শক্তি এর ভৌগোলিক অবস্থান। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ সুবিধা থাকায় শিল্প স্থাপনের জন্য এলাকাটি অত্যন্ত উপযোগী বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সফলতার জন্য যোগাযোগ অবকাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। সেই বিবেচনায় আনোয়ারার এই অঞ্চল আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।

২০১৪ সালে যাত্রা, বাস্তবায়নে লেগে গেল এক দশক

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ২০১৪ সালে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে প্রথম এই প্রকল্পের ধারণা সামনে আসে। পরবর্তী ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও প্রশাসনিক জটিলতা, অবকাঠামোগত প্রস্তুতির ধীরগতি এবং বিভিন্ন নীতিগত কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন অগ্রগতি পায়নি। বেজা সূত্র জানায়, জমি হস্তান্তর, উন্নয়ন পরিকল্পনা, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং ডেভেলপার নির্বাচনসহ বিভিন্ন ধাপে জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বছরের পর বছর আটকে ছিল। অবশেষে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও চীনের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগের ফলে প্রকল্পটি নতুন গতি পায়।

নতুন সরকারের উদ্যোগে গতি

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে। ওই সফরের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-এর মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি বিনিময় সম্পন্ন হয়। চীন সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নীতিগত অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়েছে।

৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চায়নিজ ইকোনমিক জোনে প্রায় ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসতে পারে। এরই মধ্যে ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছে বেজা। এসব কোম্পানি মূলত পোশাক, উন্নত টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, ইলেকট্রনিক্স, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, তথ্যপ্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ করবে বলে জানা গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে চীনা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ উৎপাদন কেন্দ্র স্থানান্তরের সুযোগ খুঁজছে। বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দ্বার খুলতে পারে।

এক লাখের বেশি কর্মসংস্থানের আশা 

প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় সুফল হিসেবে দেখা হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগকে। বেজার পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চলটি পুরোপুরি চালু হলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে এক লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ শ্রমিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পরিবহন খাতের কর্মীসহ বিভিন্ন স্তরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী অঞ্চলের তরুণদের জন্য বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ সীমিত ছিল। অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এর সুফল পাবে।

২০৩১ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্য

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রকল্পটি ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় প্রথম তিন বছরের মধ্যেই অন্তত ৬০ শতাংশ শিল্প প্লট কারখানা নির্মাণের উপযোগী করা হবে। পর্যায়ক্রমে রাস্তা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, টেলিযোগাযোগ ও অন্যান্য সেবা অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে নতুন গতি

চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরনির্ভর অর্থনৈতিক কেন্দ্র হলেও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এখনো অনেক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর্ণফুলী টানেল এবং বে-টার্মিনাল প্রকল্পের সঙ্গে চায়নিজ ইকোনমিক জোন যুক্ত হলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শিল্প ও লজিস্টিক হাবে পরিণত হতে পারে। চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, “চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষায়িত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে এটি কর্মসংস্থান, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকছেন মন্ত্রী-রাষ্ট্রদূত

সোমবারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক যাত্রাকে ঘিরে ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী মহল ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বদলে যেতে পারে আনোয়ারার অর্থনৈতিক চিত্র 

একসময় কৃষিনির্ভর জনপদ হিসেবে পরিচিত আনোয়ারা এখন ধীরে ধীরে শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপ নিচ্ছে। কর্ণফুলী টানেল চালু হওয়ার পর এ অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন শুধু একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল নয়; এটি চট্টগ্রামের শিল্পায়নের নতুন মাইলফলক। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আনোয়ারা হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পনগরী। দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার পর অবশেষে বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে যাওয়া এই প্রকল্প তাই শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়ার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  চায়নিজ ইকোনমিক জোন   আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল   চীন-বাংলাদেশ বিনিয়োগ   বেজা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close