মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬,
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সিইসি নেতৃত্বাধীন কমিশনের বৈঠক চলছে      মধ্যরাতে সিজেপির সঙ্গে মোদি সরকারের বৈঠক      বর্তমান সরকার আ.লীগের সঙ্গে যোগসাজশে ক্ষমতায় এসেছে: নাহিদ      গ্যাসের চাপ বিদ্যুতে      নীরব চুপ্পুর সরব দুর্নীতি      আ. লীগ আমলের ৩২ যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল সরকার      হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও নাগরিক সচেতনতায় খোলা কাগজের গোলটেবিল বৈঠক      
খোলাকাগজ স্পেশাল
পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়োগে কোটা বিতর্ক
জামালুদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ১০:০১ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়োগকে ঘিরে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের জনপরিসর। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ৬৭ শতাংশ উপজাতি (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) এবং ৩৩ শতাংশ বাঙালি কোটাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবার সরব হয়েছে ‘কোটাবিরোধী ঐক্যজোট’।

তাদের দাবি, এ কোটা ব্যবস্থার কোনো স্পষ্ট আইনগত ভিত্তি নেই। সরকারি চাকরির সর্বশেষ নীতিমালা অনুসারে ৯৩ শতাংশ মেধা ও ৭ শতাংশ কোটাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসী ও আঞ্চলিক সংগঠন বরাবরই বলে আসছে, পার্বত্য জেলার বিশেষ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়োগে আসলে কোন নীতি কার্যকর হওয়া উচিত—মেধা, নাকি প্রতিনিধিত্ব? আইনের ব্যাখ্যা কী? আর এ বিতর্কের আড়ালে কি আরও বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করছে?

এক সংবাদ সম্মেলন, বহু প্রশ্ন

গতকাল সোমবার রাঙামাটি শহরের বনরূপায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কোটাবিরোধী ঐক্যজোট দাবি করে, পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন বিভিন্ন বিভাগে নিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে একটি অলিখিত কোটা ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। সংগঠনের নেতারা বলেন, বর্তমান পদ্ধতিতে ৬৭ শতাংশ পদ উপজাতিদের জন্য এবং ৩৩ শতাংশ পদ বাঙালিদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। কিন্তু পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে এমন কোনো কোটা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।

তাদের দাবি, ২০২৪ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দেশের অন্যান্য সরকারি চাকরির মতো পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়োগেও ৯৩ শতাংশ মেধা এবং ৭ শতাংশ কোটা নীতি অনুসরণ করা উচিত।

সংবাদ সম্মেলন শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের উপদেষ্টা মো. কামাল উদ্দিন, সদস্যসচিব মো. নুরুল আলম, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মজুমদার, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম রুবেল, সদস্য মো. ইউসুফ আলীসহ অন্যান্য নেতারা।

পার্বত্য জেলা পরিষদ কী?

অনেকের কাছে বিষয়টি জটিল মনে হতে পারে। পার্বত্য জেলা পরিষদ হলো রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ধারাবাহিকতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, ক্রীড়া, সমাজসেবা, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব ধীরে ধীরে জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এসব বিভাগে শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, কারিগরি কর্মচারী ও বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেয় জেলা পরিষদ। ফলে নিয়োগের প্রশ্নটি শুধু চাকরি নয়; এটি পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষমতা, প্রতিনিধিত্ব ও সম্পদ বণ্টনের প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত।

যেভাবে কোটায় হারিয়ে যাচ্ছে মেধা

একজন সাবেক জেলা পরিষদ কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি শুধু চাকরির প্রশ্ন নয়। এটি পাহাড়ের মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।’

কারা বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করছেন?

রাঙামাটি শহরের কলেজপড়া তরুণ মাহবুব আলম কয়েক বছর ধরে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমি লিখিত পরীক্ষায় ভালো করলেও অনেক সময় শুনি কোটা পূরণ হয়ে গেছে। তখন হতাশ লাগে।’

একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে অনেক শিক্ষিত বাঙালি তরুণের। তাদের দাবি, পার্বত্য জেলাগুলোতে বসবাস করেও তারা সমান সুযোগ পাচ্ছেন না।

স্থগিত নিয়োগ : ক্ষোভের আরেক কারণ

গত কয়েক বছরে পার্বত্য জেলা পরিষদের অনেক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত বা বিলম্বিত হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ, স্বাস্থ্য বিভাগ, কারিগরি কর্মচারীসহ বিভিন্ন পদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও চূড়ান্ত নিয়োগ ঝুলে থাকার অভিযোগ রয়েছে। ফলে শুধু কোটা নয়, নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

চাকরিপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন কীভাবে হয়, উত্তরপত্র কে মূল্যায়ন করে, ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব কেন, মেধাতালিকা প্রকাশ করা হয় না কেন—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর অনেক সময় পাওয়া যায় না।

বিতর্কিত ‘৬৭-৩৩’ সূত্রের জন্ম

পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে একটি অলিখিত অনুপাত অনুসরণ করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্র ও গবেষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অতীতে বিভিন্ন নিয়োগে প্রায় ৬৭ শতাংশ বনাম ৩৩ শতাংশ অনুপাত ব্যবহার করা হয়েছে। এর পেছনে যুক্তি ছিল—পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, এ অনুপাতের পক্ষে স্পষ্ট আইন, বিধিমালা বা সংসদে পাস হওয়া কোনো কোটা কাঠামো নেই। ফলে এটি আইন নয়, বরং প্রশাসনিক চর্চা হিসেবে টিকে আছে।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ মেধা এবং ৭ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংগঠনের নেতাদের মতে, পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়োগেও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত।

আইন কী বলে?

এখানেই শুরু হয়েছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক। কোটাবিরোধী ঐক্যজোটের দাবি, আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে নির্দিষ্ট কোনো কোটা নির্ধারণের বিধান পাওয়া যায়নি। বরং সেখানে বলা হয়েছে, সমযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে স্থানীয় উপজাতি প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘অগ্রাধিকার’ এবং ‘সংরক্ষিত কোটা’ এক বিষয় নয়। অগ্রাধিকার মানে সমান যোগ্যতার ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়া। কিন্তু কোটা মানে নির্দিষ্ট শতাংশ পদ সংরক্ষণ করা। এই পার্থক্যই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

ছয় দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১। পার্বত্য জেলা পরিষদের সব নিয়োগে ৯৩ শতাংশ মেধা ও ৭ শতাংশ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা।
২। প্রশ্নপত্র প্রণয়নে জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা চালু করা।
৩। প্রশ্নপত্র জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে সরকারি ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা।
৪। উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফলাফল প্রকাশে জেলা প্রশাসনের সার্বিক নজরদারি নিশ্চিত করা।
৫। নিয়োগসংক্রান্ত নীতিমালা, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও নম্বর বণ্টনের কাঠামো প্রকাশ করা।
৬। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের পরিচয় ও ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করা।

সংগঠনের নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা নিয়োগ পরীক্ষা দ্রুত আয়োজন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়োগের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

কেন এ দাবি?

পার্বত্য জেলাগুলোতে সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরির সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে জেলা পরিষদের অধীন বিভিন্ন পদে নিয়োগকে ঘিরে সব সময়ই ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে অনেক শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণী মনে করেন, বিদ্যমান কোটা কাঠামোর কারণে তারা প্রতিযোগিতায় সমান সুযোগ পাচ্ছেন না।

আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা নিয়োগ পরীক্ষা দ্রুত আয়োজন এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত না হলে পাহাড়ের শিক্ষিত বেকার যুবকদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। তারা অভিযোগ করেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। এসব অভিযোগ দূর করতে নিয়োগের প্রতিটি ধাপ জনসম্মুখে আনার দাবি জানান তারা।

একই সঙ্গে সংগঠনটির পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, আইনগত ব্যাখ্যার পরও যদি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কালক্ষেপণ করা হয় কিংবা আগের পদ্ধতি বহাল রাখা হয়, তাহলে ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  কোটা বিতর্ক  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close